
বাদশাহ মিয়াঃ
গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে “অদম্য নারী পুরস্কার” শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত চারজন শ্রেষ্ঠ নারী তাদের অসাধারণ অবদান, সংগ্রাম ও সাফল্যের মাধ্যমে সমাজে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের জীবনের গল্প শুধু অনুপ্রেরণাই নয় বরং নারীর সক্ষমতার শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি।
শিক্ষা ও চাকরিতে সাফল্যের প্রতীক মোসাঃ সামসুন্নাহার দারিদ্র্যের সাথে সংগ্রাম করে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। তিনি উপজেলার বেজড়া গ্রামের বাসিন্দা। বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো না। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। আর্থিক সংকটের কারণে বড় দুই ভাই বোনের লেখা পড়া করা হয়নি। সামসুন্নাহার ছোট বেলা থেকেই লেখা পড়ায় আগ্রহী ছিলেন। আগ্রহ দেখে তাঁর বাবা স্কুলে ভর্তি করে দেয়, কিন্তু খাতা কলম কিনে দিতে পারেননি। পুরাতন ক্যালেন্ডার এবং ঠুঙ্গার কাগজে লিখেই চালিয়েছেন পড়া লেখা। পরীক্ষার রেজাল্ট সবসময় ভালো হতো। স্কুলের শিক্ষকদের সহযোগিতায় এসএসসি পাশ করেন। এরপর টিউশনি শুরু করে, টিউশনি করে তিনি এমএ পাশ করেন। ছোট দুই ভাই বোনের লেখা পড়া করান। ২৪ বছর বয়সে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেও তিনি থেমে থাকেননি। নানা প্রতিবন্ধকতা পেড়িয়ে শিক্ষা অর্জন করে চাকরির মাধ্যমে আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন। তিনি আজ অনেক নারীর জন্য অনুপ্রেরণা।
সফল জননী নারী জোসনা মন্ডল একজন সংগ্রামী মা, যিনি নিজের সন্তানদের সুশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও তিনি সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তুলেছেন, যা তাকে “সফল জননী” হিসেবে স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। তিনি উপজেলার মহিষতলী গ্রামের বাসিন্দা। দশম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তার বিয়ে হয়। তার স্বামী ভ্যান চালান। ২১ বছর বয়সে তার একটি কন্যা সন্তান হয়। ২৩ বছর বয়সে তার আবারও কন্যা সন্তান হয়। এতে শশুর তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়। তার স্বামীর সৎ ভাইয়েরা কোন সম্পত্তি দিতে চায় না। ২৭ বছর বয়সে তার তৃতীয় সন্তান হয় ছেলে। কষ্ট করে সংসার চালাতে গিয়ে তার চোখে ধানের শীষ ঢোকে একটি চোখ অন্ধ হয়ে যায়। এতো কষ্টে সংসার চালাতে গিয়ে কখনো তার সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ করেনি। বড় মেয়েকে ডিগ্রি কমপ্লিট করিয়ে বিয়ে দেয়, বিয়ের পর সে মাষ্টার্স পাশ করে। ছোট মেয়ে সরকারি মেডিকেলে সুযোগ পায়, সে এখন চতুর্থ বছরে সুনামগঞ্জ মেডিকেলে আছে। ছেলে দশম শ্রেণীর ছাত্র। এখন সবাই তাকে ডাক্তারের মা বলে ডাকে।
অর্থনৈতিক সাফল্যের উদাহরণ ফাহিমা বেগম নিজ উদ্যোগে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন। ছোট পরিসর থেকে শুরু করে ধীরে ধীরে নিজের ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছেন। তিনি উপজেলার মাছিয়ারা গ্রামের বাসিন্দা। বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো না। খুব ছোট বেলায় বিবাহ হয় তার। স্বামীর আর্থিক অবস্থাও ভালো ছিলো না, এমনকি মাথা গোঁজার ঠাঁই ছিলো না তার। স্বামী দিনমজুরি করে যা পেতেন তা দিয়ে ছেলে মেয়ে নিয়ে খাওয়া পড়া চলতো না। অনেক কষ্ট করে একটি গরু ক্রয় করে পালন করেন। এরপর পশু সম্পদ কার্যালয়ের সহযোগিতায় গরুর খামার গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার চারটি দুগ্ধজাত গরু রয়েছে। গরুর দুধ বিক্রি করে আজ তিনি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী একজন নারী। তার এই সফলতা স্থানীয় নারীদের উদ্যোক্তা হতে উৎসাহিত করছে।
নির্যাতনের দুঃস্বপ্ন মুছে জীবন সংগ্রামে জয়ী নারী মার্থা রত্ন। সকল নির্যাতন জয় করে জীবনের পথে বিজয়ী একজন নারী। তিনি উপজেলার কলিগ্রামের বাসিন্দা।
মার্থা রত্ন জীবনের কঠিন এক অধ্যায় অতিক্রম করেছেন। নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা পেছনে ফেলে তিনি নতুন করে জীবন শুরু করেছেন। তার দৃঢ়তা ও সাহস অন্য নারীদের জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে। অল্প বয়সে বিয়ে হয় তার। স্বামীর আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো না। তাছাড়া স্বামী কোন কাজ করতেন না। মিশনারীতে ছোট একটা চাকুরী করতেন মার্থা রত্না। তার বেতনের সব টাকা নিয়ে নিতো তার স্বামী। সংসারে টাকা খরচ না করে, নানান ধরনের অত্যাচার শুরু করে। কিছুদিন পরেই আরেকটি বিয়ে করে নিয়ে আসে। তার সঙ্গে মিলে তাকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করলে, মেয়েকে নিয়ে মার্থা রত্ন সেখান থেকে পালিয়ে যায়। এরপর কাপড়ের ব্যবসা করে মেয়েকে নিয়ে জীবন চালায়। অনেক সংগ্রাম করে মেয়েকে নার্সিং পাশ করিয়েছে। বর্তমানে তিনি ক্যানসার রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন।
উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা লায়লা রহমান বলেন, এই চারজন নারী তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসাধারণ দৃঢ়তা ও সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। তাদের জীবনের গল্প ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নারীদের এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে এবং সমাজ উন্নয়নে নারীর ভূমিকা আরও সুদৃঢ় করবে।
বাদশাহ মিয়া, মুকসুদপুর (গোপালগঞ্জ) প্রতিনিধি 











