ঢাকা ০৮:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রতিনিধি নিয়োগঃ
এটি একটি প্রিন্টভার্ষণ পত্রিকার ওয়েবসাইট। সারাদেশে জেলা উপজেলায় প্রতিনিধি নিয়োগ করা হবে। আগ্রহীদের শুধুমাত্র ইমেইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করার জন্য বলা হইলো। -বার্তা সম্পাদক।

ফ্রান্সসহ ইউরোপে বিক্ষোভের জন্য মুসলমানরা দায়ী!

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৮:০০:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬
  • ০ বার পড়া হয়েছে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফ্রান্সে সম্প্রতি আন্দোলন সহিংস রূপ নিলে দেশটির কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো এর জন্য দ্রুত মুসলিম তরুণদের দায়ী করতে শুরু করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এই সহিংসতার নেপথ্যে মুসলিম অভিবাসীদের হাত রয়েছে বলে দাবি করেন। তবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো এই ধরনের অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করে বলেন, যারা মুসলমানদের ওপর সহিংসতার দায় চাপাচ্ছেন তারা অবাস্তব ও নির্বোধের মতো কথা বলছেন। এর কিছুদিন আগে স্পেনের সিউটা ছিটমহলে মরক্কো থেকে অভিবাসীদের প্রবেশের চেষ্টাকেও কট্টরপন্থিরা মুসলমানদের একটি সুসংগঠিত আগ্রাসন হিসেবে চিত্রিত করেছিল। মূলত পশ্চিমা বিশ্বে যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংকটে ইসলাম ও মুসলমানদের দায়ী করার এই প্রবণতা দীর্ঘদিনের এবং এটি এখন কেবল প্রান্তিক রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই।

ফ্রান্সে যখন ছাত্র বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছিল, ঠিক সেই সময়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নীরবেই ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী একটি বিতর্কিত প্রস্তাব পাস করে। মধ্য-ডানপন্থি ‘ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি’ বা ইপিপির উত্থাপিত এই প্রস্তাবটির মূল বিষয় ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নে ‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশ’ এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব মোকাবিলায় একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রণয়ন করা। প্রস্তাবের পক্ষে ৩৮১টি ভোট পড়লেও ১৬৭ জন এর বিরোধিতা করেন এবং ১৫ জন ভোটদান থেকে বিরত থাকেন। কট্টর ডানপন্থি ও উদারপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানালেও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, বামপন্থি ও গ্রিনস দলের সদস্যরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। ফ্রান্স সরকারের একটি বিতর্কিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রস্তাবটি ইউরোপের মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই প্রস্তাবে ইউরোপে তথাকথিত ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশের বিভিন্ন ধাপের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে প্রভাব বিস্তার, প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রবেশ এবং আদর্শগত বৈধতা অর্জনের মতো বিষয়গুলো রয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে যে, মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো নেটওয়ার্কগুলো বিভিন্ন দাতব্য, সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক ও বৈষম্যবিরোধী কর্মকাণ্ডের আড়ালে ইউরোপীয় সমাজে প্রবেশ করছে। যদিও ইইউভুক্ত দেশগুলোর জন্য এই প্রস্তাব মানা বাধ্যতামূলক নয় এবং ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা কম, তবুও এটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি আদর্শিক কাঠামো তৈরি করছে। এর ফলে স্বাধীনভাবে পরিচালিত মুসলিম সংগঠনগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে এবং জনজীবনে মুসলিম সুশীল সমাজের অংশগ্রহণকে ক্ষতিকর হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এমনকি ব্রাসেলসভিত্তিক বর্ণবাদবিরোধী সংস্থাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ইসলামপন্থি আখ্যা দিয়ে তাদের ইইউর তহবিল থেকে বঞ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে এই প্রস্তাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ভূরাজনৈতিক ও ইসলামবিদ্বেষী প্রস্তাব ইউরোপের বাইরে থেকেও প্রভাবিত হয়ে থাকে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। আরব আমিরাত বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মিশনে অর্থায়ন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রস্তাবটি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের আইনি লড়াই ও অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টাকে এক ধরনের ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরেছে। এর মাধ্যমে ইউরোপে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতি মোকাবিলার উদ্যোগগুলো সরাসরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কট্টরপন্থিরা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি, যারা বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মুসলিমদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, সেই বামপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেও এর মাধ্যমে হেনস্তা করার চেষ্টা চলছে।

ট্যাগস :

ফ্রান্সসহ ইউরোপে বিক্ষোভের জন্য মুসলমানরা দায়ী!

আপডেট সময় ০৮:০০:৫৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ফ্রান্সে সম্প্রতি আন্দোলন সহিংস রূপ নিলে দেশটির কট্টর ডানপন্থি রাজনৈতিক দলগুলো এর জন্য দ্রুত মুসলিম তরুণদের দায়ী করতে শুরু করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও এই সহিংসতার নেপথ্যে মুসলিম অভিবাসীদের হাত রয়েছে বলে দাবি করেন। তবে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো এই ধরনের অভিযোগকে সরাসরি নাকচ করে বলেন, যারা মুসলমানদের ওপর সহিংসতার দায় চাপাচ্ছেন তারা অবাস্তব ও নির্বোধের মতো কথা বলছেন। এর কিছুদিন আগে স্পেনের সিউটা ছিটমহলে মরক্কো থেকে অভিবাসীদের প্রবেশের চেষ্টাকেও কট্টরপন্থিরা মুসলমানদের একটি সুসংগঠিত আগ্রাসন হিসেবে চিত্রিত করেছিল। মূলত পশ্চিমা বিশ্বে যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক সংকটে ইসলাম ও মুসলমানদের দায়ী করার এই প্রবণতা দীর্ঘদিনের এবং এটি এখন কেবল প্রান্তিক রাজনীতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই।

ফ্রান্সে যখন ছাত্র বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করেছিল, ঠিক সেই সময়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নীরবেই ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী একটি বিতর্কিত প্রস্তাব পাস করে। মধ্য-ডানপন্থি ‘ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি’ বা ইপিপির উত্থাপিত এই প্রস্তাবটির মূল বিষয় ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়নে ‘ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশ’ এবং মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রভাব মোকাবিলায় একটি সুনির্দিষ্ট কৌশল প্রণয়ন করা। প্রস্তাবের পক্ষে ৩৮১টি ভোট পড়লেও ১৬৭ জন এর বিরোধিতা করেন এবং ১৫ জন ভোটদান থেকে বিরত থাকেন। কট্টর ডানপন্থি ও উদারপন্থি কয়েকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী এই প্রস্তাবকে সমর্থন জানালেও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, বামপন্থি ও গ্রিনস দলের সদস্যরা এর তীব্র প্রতিবাদ জানান। ফ্রান্স সরকারের একটি বিতর্কিত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই প্রস্তাবটি ইউরোপের মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এই প্রস্তাবে ইউরোপে তথাকথিত ইসলামপন্থি অনুপ্রবেশের বিভিন্ন ধাপের কথা বলা হয়েছে, যার মধ্যে প্রভাব বিস্তার, প্রাতিষ্ঠানিক অনুপ্রবেশ এবং আদর্শগত বৈধতা অর্জনের মতো বিষয়গুলো রয়েছে। এতে দাবি করা হয়েছে যে, মুসলিম ব্রাদারহুডের মতো নেটওয়ার্কগুলো বিভিন্ন দাতব্য, সাংস্কৃতিক, শিক্ষামূলক ও বৈষম্যবিরোধী কর্মকাণ্ডের আড়ালে ইউরোপীয় সমাজে প্রবেশ করছে। যদিও ইইউভুক্ত দেশগুলোর জন্য এই প্রস্তাব মানা বাধ্যতামূলক নয় এবং ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা কম, তবুও এটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি আদর্শিক কাঠামো তৈরি করছে। এর ফলে স্বাধীনভাবে পরিচালিত মুসলিম সংগঠনগুলোকে সন্দেহের চোখে দেখা হচ্ছে এবং জনজীবনে মুসলিম সুশীল সমাজের অংশগ্রহণকে ক্ষতিকর হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এমনকি ব্রাসেলসভিত্তিক বর্ণবাদবিরোধী সংস্থাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ইসলামপন্থি আখ্যা দিয়ে তাদের ইইউর তহবিল থেকে বঞ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে এই প্রস্তাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ভূরাজনৈতিক ও ইসলামবিদ্বেষী প্রস্তাব ইউরোপের বাইরে থেকেও প্রভাবিত হয়ে থাকে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। আরব আমিরাত বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে মুসলিম ব্রাদারহুডের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করে তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মিশনে অর্থায়ন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই প্রস্তাবটি বর্ণবাদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের আইনি লড়াই ও অধিকার আদায়ের প্রচেষ্টাকে এক ধরনের ষড়যন্ত্র হিসেবে তুলে ধরেছে। এর মাধ্যমে ইউরোপে ইসলামোফোবিয়া বা ইসলামভীতি মোকাবিলার উদ্যোগগুলো সরাসরি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং কট্টরপন্থিরা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের সুযোগ পাচ্ছে। পাশাপাশি, যারা বর্ণবাদ ও ইসলামবিদ্বেষের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে মুসলিমদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, সেই বামপন্থি রাজনৈতিক শক্তিগুলোকেও এর মাধ্যমে হেনস্তা করার চেষ্টা চলছে।