আন্তর্জাতিক ডেস্ক: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট এল নিনো পরিস্থিতির কারণে বিশ্বজুড়ে খাদ্যপণ্যের বাজারদর লাগামহীনভাবে বাড়ছে, যা বিশ্বব্যাপী খাদ্যনিরাপত্তাকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ সম্প্রতি এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, এর ফলে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে খাদ্যঘাটতি ও মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও অতিমাত্রায় তাপপ্রবাহের কারণে কৃষিপণ্যের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্ববাজারে প্রধান খাদ্যপণ্যগুলোর দাম সাম্প্রতিক সময়ে কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, জলবায়ুর এই অস্বাভাবিক আচরণ অব্যাহত থাকলে আগামী বছরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
আইএমএফের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান বছরটিতে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে চালের দাম বেড়েছে প্রায় অর্ধেক, গমের দাম অর্ধেকের কাছাকাছি এবং সয়াবিনের দামও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ওপরে উঠেছে। সংস্থাটির আশঙ্কা, এই এল নিনো পরিস্থিতি আগামী বছরের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা এবং তীব্র পানির সংকটের কারণে আফ্রিকা, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের জেরে সারের বাজারদর বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে, যা পুরো বিশ্ব সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রকাশিত মূল্যসূচকেও খাদ্যবাজারের এই ঊর্ধ্বগতির চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। মাংস, শস্য, দুগ্ধজাত পণ্য, ভোজ্যতেল ও চিনির আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে, বছরের শুরু থেকে এই সূচক ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলো এই খাদ্য সংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, কারণ এসব অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশই খাদ্য আমদানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে এবং স্থানীয় পর্যায়ে উৎপাদন কমে যাওয়ায় এসব দেশের সাধারণ মানুষের পক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সোমালিয়ার অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন যে, তাদের দেশেও খরা ও উৎপাদনের ধস খাদ্য নিরাপত্তাকে প্রায় ভেঙে ফেলেছে।
এই বহুমুখী সংকট মোকাবেলায় সোমালিয়া ডিজিটাল অর্থব্যবস্থার মাধ্যমে নাগরিকদের খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। দেশটির সিংহভাগ মানুষ ইতোমধ্যে এই আধুনিক ডিজিটাল লেনদেন পদ্ধতির আওতায় এসেছে, যা সংকটের সময়ে অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ প্রমাণিত হচ্ছে। এদিকে আসন্ন জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলনে জলবায়ু অর্থায়ন এবং টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। সীমিত বাজেটের উন্নয়নশীল দেশগুলোর পক্ষে এই সংকট একা মোকাবিলা করা অসম্ভব হওয়ায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও জলবায়ু তহবিল বাড়ানো এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বহুমুখী সংকট এড়াতে জরুরি ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক কৌশল ও কার্যকর বণ্টন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অতীব জরুরি।