ফিচার ডেস্ক: গ্রামবাংলার মেলা, কীর্তন কিংবা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ ছিল ঐতিহ্যবাহী দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। একসময়ে তবলা, ডুগি, ঢোল, কর্তাল এবং দোতারার সুরে মুখর থাকত চারপাশ। তবে সময়ের পালাবদলে এবং আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় সেই সোনালী দিনগুলো এখন অতীত। ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেম ও ইলেকট্রনিক বাদ্যযন্ত্রের প্রবল জনপ্রিয়তার কারণে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে হাতে তৈরি এসব বাদ্যযন্ত্র। ফলে পৈত্রিক এই পেশা টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন কারিগররা এবং বাধ্য হয়ে অনেকে বিকল্প পেশার সন্ধান করছেন।

দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী পৌর বাজারের ননী গোপাল মোড়ে অবস্থিত স্বপন তবলা ঘর ঘুরে দেখা যায় ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের করুণ দশা। দোকানটির মালিক রবিন দাস বংশপরম্পরায় চার পুরুষ ধরে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত আছেন। ছোটবেলা থেকেই বাদ্যযন্ত্রের সান্নিধ্যে বড় হলেও বর্তমান বাজারে এর চাহিদা কমে যাওয়ায় তার চোখেমুখে এখন কেবল আক্ষেপ। অতীতে ফুলবাড়ী ছাড়াও দূরদূরান্তের বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ তবলা ও ঢোল কিনতে আসলেও বর্তমানে মাসের পর মাস দোকানে বাদ্যযন্ত্র অলস পড়ে থাকে।

আধুনিকতার প্রভাবে বিয়ে, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা যাত্রাপালায় এখন কি-বোর্ড ও অর্কেস্ট্রার ব্যবহার বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের প্রতি মানুষের আগ্রহ এবং কদর দুটোই মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। শুধু রবিন দাস একা নন, পৌর বাজারের অন্য ব্যবসায়ীরাও একই সংকটের কথা জানিয়েছেন। প্রবীর কুমার দাস বাবু নামের এক সংগীত শিক্ষক ও ব্যবসায়ী জানান, হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্র বানিয়ে আর লাভ হয় না, তাই বাধ্য হয়ে তাকেও দোকানে আধুনিক ও ডিজিটাল বাদ্যযন্ত্র রাখতে হচ্ছে।

এই পরিবর্তনের ফলে কেবল একটি ব্যবসা বা পেশাই বিলীন হচ্ছে না, বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি সমৃদ্ধ কারিগরি জ্ঞানও চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ সাধনা ও হাতে-কলমে শেখা ছাড়া নিখুঁত তবলা বা ঢোল তৈরি করা সম্ভব নয়। রবিন দাসের মতো কারিগররা কোনোমতে পেশাটি আঁকড়ে থাকলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কেউ এই ঝুঁকিপূর্ণ ও স্বল্প আয়ের পেশায় আসতে নারাজ। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো কেবল স্মৃতিতেই বেঁচে থাকবে গ্রামবাংলার এই শেকড়সংশ্লিষ্ট বাদ্যযন্ত্রগুলো।