জাতীয় ডেস্ক: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন সার ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশ হওয়ার পর থেকেই তীব্র অসন্তোষ ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলায় প্রকাশিত ১৫ জন ডিলারের তালিকার ১০ জনই কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এই তালিকা প্রকাশের পর স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। তালিকাভুক্ত ব্যক্তিদের অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আওয়ামী লীগ ও দলটির সহযোগী সংগঠনের রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। এমন পরিস্থিতিতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়ায় এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের নাম আসায় পুরো বাছাই প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে গভীর সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। ডিলারশিপের এই তালিকায় নাম থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন ইউনিয়ন পর্যায়ের আওয়ামী লীগ ও কৃষক লীগের শীর্ষ পদের নেতারাও রয়েছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং স্থানীয় যাচাই-বাছাই কমিটির প্রাথমিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে এই বিতর্কিত ব্যক্তিরা স্থান পেলেন, তা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিতর্কিত এই তালিকার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল ও স্মারকলিপি প্রদান করেছেন সংক্ষুব্ধ রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ডিলার নিয়োগের এই তালিকা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে এবং অনেকেই এর পেছনে বড় ধরনের সিন্ডিকেটের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ তুলছেন।
নাগেশ্বরীর মতো লালমনিরহাট ও ঝালকাঠিতেও সার ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় তালিকাভুক্ত ডিলারদের মধ্যে চিহ্নিত মাদক কারবারি ও বিতর্কিত ব্যক্তিদের নাম আসায় স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঝালকাঠির বিভিন্ন ইউনিয়ন ও পৌরসভায় ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সম্পূর্ণ বঞ্চিত করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে ৩৪ জন নতুন ডিলারের মধ্যে মাত্র কয়েকজনের সারের ব্যবসা করার পূর্ব অভিজ্ঞতা রয়েছে, বাকিরা সম্পূর্ণ নতুন এবং দলীয় তদবিরের জোরে এই লাইসেন্স পেয়েছেন। নীতিমালা অনুযায়ী ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে গোডাউন, আর্থিক সচ্ছলতা, লাইসেন্স এবং ব্যবসার দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে প্রধান শর্ত হিসেবে গণ্য করার কথা থাকলেও বাস্তবে তার ব্যত্যয় ঘটেছে। হবিগঞ্জেও একই চিত্র দেখা গেছে, যেখানে ৭৮টি ইউনিয়ন ও ছয়টি পৌরসভায় ডিলার নিয়োগ ঘিরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে এবং অস্তিত্বহীন অনেক প্রতিষ্ঠানও ডিলারশিপ বাগিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে সততার সঙ্গে সারের ব্যবসা পরিচালনা করা অনেক অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ডিলারশিপ না পাওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ক্ষমতা ও অর্থের জোরে অযোগ্য ব্যক্তিদের হাতে সারের ডিলারশিপ তুলে দেওয়ার ফলে কৃষিমতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় কৃষকরা। মাঠপর্যায়ের প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়ায় স্থানীয় কৃষিপণ্য সরবরাহে সিন্ডিকেট তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা। নতুন ডিলারদের তালিকায় এমন অনেকে স্থান পেয়েছেন যারা বিগত সরকারের সময় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন এবং চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। মাঠপর্যায়ের এই চরম অসন্তোষ নিরসনে অবিলম্বে ডিলার নিয়োগের তালিকা পুনর্মূল্যায়ন করে প্রকৃত ও অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের ডিলারশিপ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগীরা।
সার ডিলার নিয়োগে অনিয়ম ও দলীয়করণের এই অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে বিপরীতমুখী বক্তব্য পাওয়া গেছে। নাগেশ্বরী উপজেলা বিএনপির পক্ষ থেকে ডিলারদের তালিকায় আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অপপ্রচার বলে দাবি করা হয়েছে। তবে দলটির একাংশের নেতাকর্মীদের দাবি, স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের যোগসাজশেই মূলত এই বিতর্কিত তালিকা তৈরি করা হয়েছে এবং আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে। লালমনিরহাট ও ঝালকাঠির স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে যে উপজেলা কমিটির সুপারিশ এবং তিন সংসদ সদস্যের পাঠানো তালিকা থেকেই চূড়ান্তভাবে ডিলার নিয়োগের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। জেলা সার বীজ মনিটরিং কমিটি এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে তারা কেবল মাঠপর্যায়ের কমিটির সুপারিশ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করেছেন, ফলে কে কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত তা তাদের পক্ষে সুনির্দিষ্টভাবে জানা সম্ভব হয়নি। ডিলার নিয়োগের এই পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা, যা শেষ পর্যন্ত সার ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে। সরকারের নীতিমালার তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক তদবির ও প্রভাবে ডিলার নিয়োগের ফলে সার কালোবাজারি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষি খাতের সংশ্লিষ্টরা। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে বিতর্কিত ডিলারদের তালিকা বাতিল করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের ডিলারশিপ প্রদান করবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়। সাধারণ কৃষকদের স্বার্থ রক্ষা এবং সারের বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছ তদন্ত অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও কৃষক সমাজ।