শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৪৯ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
E-Paper-12.10.2021 E-Paper-15.08.2021 নড়াইলে কঠোর লকডাউন চলছে, আক্রান্তের হারও হু হু করে বাড়ছে থেমে নেই মৃত্যু কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টারে গুলি: ‘জাকারবার্গ’কে খুঁজে দিতে পুরস্কার ঘোষণা! মাগুরার মহম্মদপুরে যুবকের বস্তাবন্ধি লাশ উদ্ধার। ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশু কন্যার জীবন বাঁচাতে সাহায্য কামনা অনুষ্ঠিত হলো তথ্য কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল কর্মশালাঃ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মীদেরকে সরকার ও জনগণের মধ্যে “সেতুবন্ধ” বললেন সচিব নগরকান্দায় বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ আহত -১৫ কুষ্টিয়ায় আলোচিত ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা আটক আলফাডাঙ্গায় আ’লীগ নেতার বাড়িতে হামলা গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ

হাতছানি

-এড. গাজী শাহিদুজ্জামান লিটনঃ

১.
যে তে’রাস্তার মোড় পেরিয়ে নুরুল হাসান বাজারে যাবেন, সেখানেই ছেলেগুলো জটলা পাকিয়ে আছে। নুরুল হাসান ধীরে ধীরে হাঁটেন। জটলার কাছাকাছি পৌঁছে চকিতে দেখে নেন ওদের মুখগুলো। বারো-চৌদ্দ-পনেরো বছর বয়সী কিশোর সব। রাস্তায় চলাচলরত পথচারীদের প্রতি ওদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নিজেদের মতো করে গল্পগুজব, হাসাহাসি, খিস্তি-খেউরে মত্ত ওরা। মোড় পেরোনোর সময় কিশোরগুলো ওকে সালাম দিয়ে পথ করে দেবে – ভেবেছিলেন। ফস্ করে দেশলাই জ্বেলে সিগারেট ধরায় এক কিশোর। তারপর আগুনটা যাতে নিভে না যায়, দু’হাত গোল করে তার মাঝখানে রেখে বাতাস থেকে আগুনটাকে বাঁচায়। আর অন্য কারো কারো ঠোঁটে গোঁজা সিগারেটগুলো ধরিয়ে দিতে থাকে। তিনটি মোটরসাইকেল স্ট্যান্ডের উপর কাত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ইতস্ততঃ। নুরুল হাসানের উপস্থিতি ওদের মধ্যে বিন্দুমাত্র চাঞ্চল্য আনতে পারে না। রাস্তার কিনার দিয়ে কোনোরকম গা বাঁচিয়ে জায়গাটুকু পেরিয়ে আসেন নুরুল হাসান। ক্রোধে তার শরীরে আগুন জ্বলতে থাকে। পুলিশের একজন রিটায়ার্ড সাব-ইন্সপেক্টর তিনি।
তবুও ওদেরকে মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস হয় না তার। পত্রিকায় দেখেছেন, এই সব নেশাসক্ত বখাটেগুলো খুব ভয়ংকর হয়। এ ধরণের কিশোররাই গড়ে তুলেছে নানা নামের গ্যাং – নাইন স্টার, ডিস্কো বয়েজ। অন্যদের সালাম পেতে, গার্লফ্রেন্ডের চোখে হিরো হওয়ার মোহে ওরা বেপরোয়া!
নুরুল হাসান হাঁটার গতি বাড়িয়ে দেন। স্ত্রী মারা গেছেন বছর দুই হলো। অবসরের পরে তাই ছেলে – ছেলেবৌ’র প্রযতেœই আছেন নুরুল হাসান। সারাদিন শুয়ে-বসে বই, পত্র-পত্রিকা পড়তে পড়তে একঘেঁয়েমি চলে আসে। কেমন যেনো অসহায় লাগে। তাই নিজেই জোর করে কিছু কিছু দায়িত্ব তুলে নিয়েছেন নিজের কাঁধে।
নুরুল হাসানের একমাত্র পৌত্র আদিব। বয়স এখনও বছর পেরোয়নি। আজ দুপুর থেকে বাচ্চাটার জ্বর। বিকেলে কি এক অজানা কষ্টে আদিব প্রায় আধঘন্টা একটানা কেঁদেছে। মায়ের দুধ, আদর, অন্য কোনো খাবার, দাদা নুরুল হাসানের হাস্যকর সব অঙ্গভঙ্গী কিছুই তাকে থামাতে পারেনি। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে খানিক আগে। বৌমা, আমি ওর জন্য ওষুধ আনতে যাচ্ছি বলে দ্রুত বেরিয়ে পড়েছেন নুরুল হাসান।
আদিবের লক্ষ্মণ বর্ণনা করে পরিচিত ফার্মেসী থেকে ঔষধ নিয়ে দ্রুতই ফিরে আসেন তিনি। আসার পথে অবশ্য ছেলেগুলোকে সেখানে দেখা যায় না। ঔষধগুলো বৌমাকে দিয়ে, পাঞ্জাবী খুলে সোফায় বসে একটু হাঁফ ছাড়েন নুরুল হাসান।
মিনিট খানেকের মাথায় বৌমার বিরক্তিমাখা তীক্ষè ডাকে তিনি ফিরে তাকান। দেখেন, জ্বরের সিরাপটা তখনও বৌমা চোখের সামনে ধরে রেখেছে।
– বাবা, এই ওষুধটারতো ‘ডেট’ নেই! আপনার একটু দেখে আনা উচিত ছিলো না?!
বৌমার কথা শুনে লজ্জায়, দুঃখে, ক্ষোভে নির্বাক হয়ে যান নুরুল হাসান। অনেক কষ্টে – দাও পাল্টে নিয়ে আসি, বলে সিরাপটা নিয়ে প্রায় ছুটতে থাকেন। তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ। কেমন করে ওকে মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ গছিয়ে দিলো ওরা!? এতো দিনের সম্পর্ক!
দোকানি অবশ্য – কাকা, ভুল হয়েছে। ইচ্ছে করে এমন কিছু আমরা কখনো আপনার সাথে করবো না, বলে সান্তনা দেয়। নুরুল হাসানের ক্ষোভ তাতে সামান্য প্রশমিত হলেও একেবারে নিভে যায় না । নিজের মনে তিনি বোঝেন, এ তার বার্ধক্যকে নিয়ে এক প্রকার উপহাস।
২.
ভোর রাতে আদিবের অসুখে নতুন উপসর্গ যুক্ত হয় – কাশি। ভোর রাত থেকে সে প্রায় অবিশ্রাম কাশতে থাকে। কাশির শব্দে ঘুম ভাঙে নুরুল হাসানের। ছেলে, বৌমাকে ডাকতে ডাকতে ওদের ঘরে উঁকি দেন। দেখেন রাকিব আর বৌমা দু’জনেই বিছানায় উঠে বসেছে। কী হয়েছে বৌমা? বৌমা উত্তর দেয় না, নির্বাক বসে আছে সে। ছেলে উষ্ণ কণ্ঠে বলে, দেখতেইতো পাচ্ছো, কাশি থামছেই না। নুরুল হাসান আদিবের মাথায় হাত বুলিয়ে দেবার জন্য এগিয়ে আসেন। তখনই আবার কাশিটা শুরু হয়। খুব কষ্ট পাচ্ছে বাচ্চাটা। মনে হচ্ছে দমটাই বেরিয়ে যাবে। বৌমা ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। নুরুল হাসান খানিকণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। তারপরও বলেন – ধৈর্য্য ধরো, মা। একটু ফর্সা হতে দাও। আমি নিজে যেয়ে ফজর আলী ডাক্তার সা’বকে জাগিয়ে ওষধ নিয়ে আসবো।
কান্না মুছে বৌমা রাকিবের দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে দু’দিকে মাথা ঝাঁকায়। রাকিব কয়েক সেকেন্ডে মনে মনে গুছিয়ে নেয়, কীভাবে বলবে কথাগুলো। তারপর মৃদু, শান্ত কিন্তু দৃঢ়স্বরে বলে – থাক বাবা, তোমার যেতে হবে না। ফর্সা হলে আমিই বেরোবো। নুরুল হাসান বিস্মিত হন – তোকেতো সকাল সকালই কাজে বেরোতে হয়। ওষুধ আনতে গেলে তোর কাজে বেরোতে দেরি হয়ে যাবে। দাদুভাই’র ওষুধ আমিই নিয়ে আসবো। উত্তরে রাকিব গলার ঝাঁঝ সামান্য বাড়িয়ে বলে – বাবা, তোমার বয়স হয়ে গেছে। লোকজন তোমাকে ঠকাতে শুরু করেছে। এক কাজে এখন তোমাকে একাধিকবার যেতে হচ্ছে। তাতে ঝামেলাই কেবল বাড়ছে! ছেলের কথায় নিস্তব্ধ হয়ে যান নুরুল হাসান। কেমন নিস্তেজ লাগে! নিজের ঘরে ফিরে দেয়ালে হেলান দিয়ে বিছানায় বসেন। অনেক কথা মনে পড়ে যায় তার। ভাবেন, এই নুরুল দারোগার নাম শুনলে একদিন “বাঘে-মোষে এক ঘাটে জল খেতো”।
৩.
সাব-ইন্সপেক্টর সাহেব আলী এই নিধিগঞ্জ থানায় বদলি হয়ে এসেছেন প্রায় বছর খানেক হলো। নুরুল হাসান অবসর নেয়ার পরও থানার টান ছাড়তে পারেননি। তাই মাঝে মাঝেই এই বাড়ির কাছের নিধিগঞ্জ থানায় এসে গল্পগুজব করতে বসেন। আর পুলিশে থাকাকালীন নিজের নানা ‘কৃতিত্বের’ কাহিনী পেড়ে বসতেই যে যার মতো কেটে পড়েন। কেউ বলেন, ওসি সাহেব ডাকছেন; কেউ বলেন, বাসায় জরুরীভাবে বাজার করতে যেতে হবে; কেউ বলেন, বাথরুম থেকে আসি। কেউই আর ফেরেন না। নুরুল হাসান কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে বাড়ির পথ ধরেন।
আজ অবশ্য নুরুল হাসান থানায় এসেছেন অন্য কারণে। প্রতিবেশি আমজাদের বাড়িতে গতরাতে বড় ধরণের চুরি হয়েছে। সিঁধ কেটে ঘরে ঢুকেছিলো জনা তিনেক। বাইরেও হয়তো ছিলো আরো দু’একজন। আমজাদের বাড়িতে এখন কেবল ওরা স্বামী-স্ত্রীই বসবাস করে। স্টীলের আলমারি খোলার শব্দে জেগে চমকে উঠেছিলো আমজাদের বউ। ঘোর কাটিয়ে চোর চোর বলে চিৎকার করতেই ধারালো ছুরি বের করে দু’জন এগিয়ে এলো। আমজাদও উঠে বসেছিলো চিৎকার শুনে। ধারালো ছুরি দিয়ে আমজাদের কপালে একটা রক্তাক্ত সরলরেখা টেনে দিলো একজন। তারপর দুই ছুরিধারী একযোগে ওদের শাসালো – কথা বললেই এর পরের পোচটা হবে গলায়। তারপর চোখের সামনে হাওয়া হয়ে গেলো, অনেক কষ্টার্জিত নগদ টাকা, সোনার গয়না, কাপড়-চোপড়, ……।
নুরুল হাসান আমজাদের মুখে সব শুনে ওকে নিয়ে থানায় এসেছেন। সাব-ইন্সপেক্টর সাহেব আলী সাত- সকালে নুরুল হাসানকে দেখে চমকে ওঠেন – এই বুঝি শুরু হবে ম্যারাথন কিচ্ছা! নুরুল সাহেব একেবারে মুখোমুখি হয়ে পড়ায় তিনি আর পালাতে পারেন না। ঘটনা বলার জন্যে নুরুল হাসান আমজাদকে নির্দেশ দেন। বর্ণনা শেষ হলে নুরুল হাসান সাহেব আলীকে এফ.আই.আর করার তাগাদা দেন। সাহেব আলীর অবশ্য এফ.আই.আর করার কোনো গরজই দেখা যায় না। নুরুল হাসান বিব্রত হয়ে আমজাদের দিকে তাকান। সাহেব আলী দু’হাতের আঙ্গুলগুলো পরস্পরের ভিতর ঢুকান, কনুই দুটো টেবিলে রেখে ওভাবেই হাত দ’টো উঁচু করেন। পরস্পর সন্নিবদ্ধ আঙ্গুলগুলোর উপর থুতনি রেখে কিছুক্ষণ চোখ বুজে থাকেন। চোখ খুলে একটু ঝ্ুঁকে টেবিলের ওপারে বসা নুরুল হাসান আর আমজাদের সাথে “দূরত্ব” কমানোর কৃত্রিম চেষ্টা করেন। তারপর, যেনো শতাব্দী-সেরা কোনো ভাষণ দিতে যাচ্ছেন এমন ভঙ্গীতে শুরু করেন – ওস্তাদ, আপনিতো রিটায়ার্ড করেছেন বেশিদিন হয়নি। বোঝেনতো, এসব ক্লু-লেস মোকদ্দমা করে কোনো লাভই হয় না। শুধোশুধি একগুচ্ছ টাকা খরচ! না হবে কোনো মালামাল উদ্ধার, না হবে কারো সাজা। মাঝখান থেকে কিছু নিরীহ লোকজন ধরে কোর্টে চালান দিতে হবে। স্কেচ-ম্যাপ, চার্জশীট, সাক্ষীদের ১৬১ ধারার জবানবন্দী, আসামী চালানের ফরোয়ার্ডিং – মেলা কাগজ-কলম ক্ষয়। আই.ও. সাহেবের মটরসাইকেলের তেল, মেলা পরিশ্রম, মেলা হাঙ্গামা! তারপর এলাকায় এ ধরণের চুরি-ডাকাতি হচ্ছে জানলে ওসি সাবকে এসপি স্যারের ধমক খেতে হবে। আর তাছাড়া দেখেন, আমজাদ এমনিতেই নিঃস্ব হয়ে গেছে। ও কি মামলা-মোকদ্দমা চালানোর এতো খরচ বহন করতে পারবে?- সাহেব আলীর কন্ঠে কৃত্রিম দরদ ঝরে পড়ে। নুরুল হাসানের একবার মনে হয়, চিৎকার করে বলে – চুরি, ডাকাতি, হত্যা এসবতো সকল শান্তিপ্রিয় নাগরিকের বিরুদ্ধে অপরাধ, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ। এসব মোকদ্দমার বাদীতো হয় রাষ্ট্র। টাকা খরচ করে রাষ্ট্র। আমজাদতো একজন সাক্ষী মাত্র! নাগরিককে নিরাপদ রাখার দায়িত্বতো রাষ্ট্রের।
পরের নিমেষেই মাথার ভিতর উঁকিঝুঁকি মারে বাস্তবতার বোধ – এ সব খুবই হাস্যকর শোনাবে। শব্দগুলো ইতিউতি ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসবে ওরই মগজে। কেননা বইয়ে লেখা নিয়ম বইয়েই আটকে রেখেছে এরা।
সাহেব আলী আর আমজাদ দু’জনের মুখের দিকে তাকাতেই লজ্জা হচ্ছে নুরুল হাসানের। কারো দিকে না তাকিয়ে অনেক কষ্টে চেয়ার থেকে নিজের দেহটাকে টেনে উঠিয়ে নীরবে হাঁটতে শুরু করেন নুরুল হাসান। আমজাদও নিঃশব্দে তার পিছু নেয়। বাড়ি ফেরার পথে তে’রাস্তার মোড়ে এসে আমজাদ ওকে সান্ত্বনা দেয়ার চেষ্টা করে – দারোগা ভাই, এখন যুগটাই এমন। টাকা-পয়সা কিছু খরচ লাগবেই। আর নেতার একটা ফোন। আপনি আস্তে আস্তে বাড়ি চলে যান। আমি নেতার সাথে কথা বলে আসি।
বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে নুরুল হাসানের মনে হয়, তিনি যেনো অপ্রয়োজনীয় এক চিলতে আবর্জনা, হিজিবিজি লেখা এক টুকরো ছেঁড়া কাগজ। হাঁটতে হাঁটতে নুরুল হাসানের দেহ সংকুচিত হতে থাকে। দৈর্ঘ্যে – প্রস্থে কমতে কমতে তিনি একটা ফুটবলের আকৃতি নেন। তারপর শুকনো একটা মাটির ডেলা। অবশেষে ছোট একটা ধুলিকণায় রূপান্তরিত হন নুরুল হাসান।
একটা দমকা বাতাসে কোটি ধুলিকণার সাথে উড়তে শুরু করেন। বাকি ধুলিকণারা আবার ঝরে পড়ে পৃথিবীর জমিনে। নুরুল হাসান উড়তে উড়তে ফুল হয়ে যান। উড়ে উড়ে চেনা পৃথিবী পেরিয়ে, চেনা আকাশ পেরিয়ে, চেনা তারাদের পেরিয়ে তিনি উড়তে থাকেন অসীম শূণ্যে। সুখের হিল্লোল ছড়িয়ে পড়ে তার পাঁপড়িতে পাঁপড়িতে। দূরের তারারা হাতছানি দিয়ে ডাকছে তাকে।

Print Friendly, PDF & Email


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ