সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১০:০৭ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
E-Paper-12.10.2021 E-Paper-15.08.2021 নড়াইলে কঠোর লকডাউন চলছে, আক্রান্তের হারও হু হু করে বাড়ছে থেমে নেই মৃত্যু কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টারে গুলি: ‘জাকারবার্গ’কে খুঁজে দিতে পুরস্কার ঘোষণা! মাগুরার মহম্মদপুরে যুবকের বস্তাবন্ধি লাশ উদ্ধার। ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশু কন্যার জীবন বাঁচাতে সাহায্য কামনা অনুষ্ঠিত হলো তথ্য কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল কর্মশালাঃ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মীদেরকে সরকার ও জনগণের মধ্যে “সেতুবন্ধ” বললেন সচিব নগরকান্দায় বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ আহত -১৫ কুষ্টিয়ায় আলোচিত ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা আটক আলফাডাঙ্গায় আ’লীগ নেতার বাড়িতে হামলা গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ

সেকালে সিনেমা দেখার গল্প

-মফিজ ইমাম মিলন

ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকালে আপনা-আপনি তুলনা এসে পড়ে। আমাদের কালে এতো আনন্দের উৎস কোথায়ইবা ছিলো আর কেনোইবা তা হারিয়ে গেলো; কে বলবে? সেকালে একটা সিনেমা দেখার প্রস্তুতি কতোদিন আগে থেকেই না নিতে হতো। একাল তো বোঝা যায়, বর্তমানটা সময়। কিন্তু সেকাল? সপ্তম এডওয়ার্ডের টাকমাথা অথবা মুকুটপরা রানী ভিক্টোরিয়ার প্রতিকৃতি বসানো রুপার টাকার আমল; বৃদ্ধাঙ্গুলি আর তর্জনীর মাথায় বসিয়ে টোকা দিয়ে যে টাকার শব্দ শুনে বোঝা যেতো, সেটা আসল না খাদ-মেশানো-সেই কাল? সেই বৃটিশ আমল? না, আমাদের সেকাল মানে বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকের পাকিস্থানের আমল।
আমাদের শৈশবে ঈদ ছিল অফুরন্ত ভাললাগার গল্প।একটা নতুন জামা পাবার গল্প। দল বেধে বেড়াতে যাওয়া, ঘপা ঘপ সেলাম করে সেলামী পাবার প্রত্যাশায় দাঁড়িয়ে থাকা। এক রিক্সায় পাঁচ-ছয়জন চড়ে রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়ানো। অথবা কয়েক বন্ধু মিলে দূরে গেরামে গিয়ে লুকিয়ে বিড়ি সিগারেট টান দিয়ে মজা নেয়া। তবে ঈদের দিনে সিনেমা দেখা এবং ষ্টুডিওতে যেয়ে ছবি তোলা ছিল সবচেয়ে আনন্দের। যে আনন্দের সাথে কোন তুলনা হয় না। ঈদের দিনে টিকেট কেটে সিনেমা দেখা মোটামুটি একটা হিরোর মর্যাদা লাভ সমান আর কি!
সে সময়ে একটা সিনেমা দেখার প্রস্তুতি কতোদিন আগে থেকেই না নিতে হতো। কে কে যাবে, কার সাথে যাবে, বড়ো বু’কে খবর দাও, ছোটটাকে সঙ্গে নাও, রিকসাওয়ালাকে ঠিক করে রাখ; কয়টার শো ভালো হবে? এমনই কতোই না প্রস্তুতি দেখেছি মা-খালাদের। এরপর তাদেরও ছিলো সাজ-গোজের একটা বিষয়। সিনেমা দেখে যখন বাড়ি ফিরতো, তখন কলকল করতে থাকতো সবার মুখ। কয়েকদিন তো তারা কেমন জানি একটা ঘোরের মধ্যেই থাকতো। ওই সিনেমার গান মুখে মুখে ফিরতো তাদের; সুর মিলুক না মিলুক, গান গাওয়া চাই-ই চাই। তবে গান গাওয়ার ক্ষেত্রে বিরহের গানের মার্যাদাই ছিল বেশী। কালে কালে টেলিভিশন, ভিসি আর, ডিশ, ডিভিডি, আইফোন স্মার্টফোন সেট তো এখন হাতে হাতে। সিনেমা ছাড়া আরো অনেক কিছু দেখা যায় সেগুলোতে।

১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের কথা; উপন্যাসিক আকবর হোসেনের ’অবাঞ্ছিত’ উপন্যাসকে সিনেমা বানিয়েছিলো জুপিটার ফিল্মস। সারাদেশে বিশেষ করে নারীদের মধ্যে দারুণ সাড়া ফেলে এই সিনেমা দেখার। অন্যান্যদের সঙ্গে আমাকেও নেওয়া হয় সিনেমাহলে। ‘অবাঞ্ছিত’ শব্দের অর্থ কী-মা? ছোটখালা কেউই বলতে চাননি। এক সময় বিরক্ত হয়ে ছোটখালা বললেন, অবাঞ্ছিত মানে গুনাহ। গুনাহ শুরু হয়ে গেলা; হঠ্যাৎ নায়ক আজিমের লিপে গান-
‘চোখ ফেরানো যায় গো
তবু মন ফেরানো যায় না
কেমন করে রাখি ঢেকে
মনের খোলা আয়না’
নায়িকা সুজাতা বৃষ্টিতে ভিজে সাদা কাপড় শরীরের সঙ্গে সাটিয়ে রেখেছেন। পাঁয়ের হাঁটু পর্যন্ত কাপড় দু’হাত দিয়ে চিপড়ে পানি ঝরাচ্ছে। আমার তো নজর স্থির হয়ে গেছে হাঁটু পর্যন্ত। সেসময় মেয়েদের হাঁটু দেখা শুধু গুনাহ-ই ছিলো না, ছিল কবিরা গুনাহ। কিন্তু পয়সা খরচ করে দূর-দুরান্ত থেকে এসে লম্বা লাইনে দাড়িয়ে, আবার কেউ ব্লাকে টিকিট কেটে এই গুনাহ দেখার জন্য কেনো আসে?
আরো অনেক ঘটনা সেই সিনেমার, সব মনে আসছে না। তবে নায়িকার ছেলে হারিয়ে গেছে; তিনি নদীর পাার, হাটের ভিতর অপরিচিত মানুষের কাছে জিজ্ঞাসা করে চলেছেন–‘তোমরা আমার খোকাকে দেখেছো কি না। খোকা, খোকা তুই কোথায় গেলি?’
আমারা যারা দর্শক তারা কিন্তু কয়েকবার খোকাকে দেখতে পেলাম। এক ছেলে হাওয়াই মিঠাই খাচ্ছে, খোকা তার পিছন পিছন ঘুরছে।

তার মা সুজাতা পাশ দিয়েই হেঁটে গেলো, দেখতে পেলো না তার খোকাকে। এই না দেখার কষ্টে সিনেমা হলের পর্দায়, “কেহই করে বেচাকেনা কেহই কান্দে,
রাস্তার পরে ধরবি যদি তারে, চলো মুর্শিদের বাজারে।
… নিজের ঈমান ওজন করো
বিস্মিল্লহকে চাপা রাখ
হৃদপিন্ডের ভিতরে,
চলো মুর্শিদের বাজারে”।
আমি জিজ্ঞেস করি-মা, মুর্শিদ কী? মুর্শিদের বাজার কোথায় মেলে? আরো কিছু জিজ্ঞাস করতে চাচ্ছিলাম; তার আগেই ঠুটি চেপে ধরে ছোটখালা—’চুপ,একদম চুপ। গান শুনতে দে। শীতকালে ঠোঁট এমনিতেই ফাটা ফাটা থাকে। হলুদ পমেট ছাড়া ছেলেদের জন্য লাল কারবলিক সাবান, যাতে শরীরে খুজলি-পাচড়া না হয়। খালার ঠুটি চিপায় আমার ততোক্ষণে রক্ত আসতে শুরু করেছে ঠোঁটে।
পাশের সিটের মাঝবয়সী দুই নারী আসো আসো করে তাদের কাছে টেনে নেয়। মানুষ মাত্রই আদর সোহাগ পছন্দ করে। মানুষ কেনো; জীবজন্তু; পশুপাখিরা ও তাই করে। ভদ্রমহিলাদের আদর-সোহাগ পেয়ে আমিও ব্যাথার কথা ভুলে গেলাম, কান্না থেকে যাচ্ছিল। হঠ্যাৎ ছোটখালা বাজপাখির মতো ছো মেরে তাদের কাছ থেকে আমাকে ছিনিয়ে আনলেন। তাদের সাথে এই দুর্ব্যবহারের কারণ কিছুই বুঝতে পারলাম না। তবে ভদ্রমহিলা দু’জন প্রতিবাদ দূরের কথা কোন আওয়াজও করলেন না। ছোটখালার দিকে অদ্ভুত এক উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলেন। তাদের দৃষ্টিতে কি কথা ছিলো আমি বুঝতে পারিনি। তবে ফেরার পথে যেটুকু বুঝেছিলাম তা হচ্ছে, ওনাদের পায়ে স্যান্ডেল ছিলোনা। জুতা-স্যান্ডেল পায়ে দেওয়া তাদের নিষেধ। সেকালে হাটে-বাজারে পতিতাপল্লীর মেয়েদের খালি পায়ে আসতে হতো। তারা ’দেহ ব্যবসা’ করে। তাদের কোলে চড়ার জন্য বাসায় এসে আর অতিরিক্ত মার খেতে হয়নি। কিন্তু ‘মুর্শিদ’ দেহব্যবসা , ‘পতিতাপল্লী’’, এসব শব্দের অর্থ কিছুই বুঝতে পারলাম না।

সিনেমা দেখার স্মৃতিকথা লিখতে গিয়ে অন্য স্মৃতির ভীড় বাড়ছে। যে স্মৃতি একান্তই আমার। যদিও কোন কিছুই একান্ত নিজের বলে থাকে না; সেখানে নানাজন, নানা সময়ে উঁকি মারে। তার পরও না চাইলেও তাকে আমি আগলে রেখেছি, কিংবা আপন করে রাখতে হয়েছে। দৃশ্যত জন্মের আগের কোন স্মৃতি আমার নেই। মৃত্যুর পরে কী হবে, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত কোন তথ্য অন্তত আমার জানা নেই। আছে শুধু বিশ্বাস-ভরসা আর পরম তৃপ্তি লাভের আকাঙ্খা। সেই আকাঙ্খা নিয়েই স্মৃতি আগলে বেচে থাকা।

সিনেমা দেখার সঙ্গে আমার মায়ের মধুর স্মৃতি জড়িয়ে থাকায় এ ব্যাপারে কলম চালানো কষ্টের। তবে সুখ ও আনন্দ স্মৃতি হচ্ছে, মায়ের বদৌলতে আমি সম্পূর্ণ বিনা পঁয়সায় ‘হারানো সুর’, ‘হাসপাতাল’, ‘দত্তা’, ‘পথে হলো দেরী’, ‘শিল্পী’, ‘মায়মৃগ’,‘মা ও ছেলে’, ‘লুকোচুরি’, ‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘গৃহদাহ’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘হারমানা হার’, ‘জীবন জিজ্ঞাসা’, ‘সপ্তপদী’—এমন অনেক ভারতীয় বাংলাছবি দেখার সুযোগ পেয়েছি। কোলে চড়ে যাওয়ার স্মৃতি মনে নেই, তবে রিকসার পাদানিতে হাঁটু গেড়ে বসে যাওয়া, মায়ের সঙ্গে দোতালায় মহিলাদের নির্দিষ্ট জায়গায় বসে সিনেমা দেখার বেশ কিছু স্মৃতি মনে আছে। চেকার বা সুপারভাইজার ডান হাতে টর্চ খাড়া করে কাছে এসে জিজ্ঞেস করতেন- টিকেট.. এই ছেলে কার সঙ্গে? মা তখন তেড়ে উঠতেন-‘ওর টিকেট লাগবে না ও ছোট।’ মা তাকে অপছন্দ করলেও আমার কিন্তু খুব ভালো লাগতো। কি ক্ষমতা , কী তার দাপট। টর্চ কয়েকবার নাড়াচাড়া করে আলো ফেলে ধমকে উঠতেন ‘টিকেট, টিকেট দেখাও।’ সেই থেকে মনে আশা ছিলো বড়ো হয়ে সিনেমা হলের টিকেট চেকার হবো। সব সিনেমা বিনা পয়সায় দেখবো, আর দাপট দেখিয়ে টিকেট চেক করবো। তা অবশ্য হওয়া হয়ে ওঠেনি। পরদিন অংক ক্লাসে দু’হাত একসঙ্গে, এমন হুঙ্কার শুনবার সঙ্গে সঙ্গে সিনেমা দেখার, চেকার হওয়ার সব সাধ-আহ্লাদ উড়ে যেতো।
ফরিদপুর শহরে যে সিনেমা হলে আমরা সিনেমা দেখতাম, তার আদি নাম ‘ফরিদপুর টাউন থিয়েটার’। এর বর্তমান বয়স ১৪৪ বছর। তৎকালীন হিন্দু জমিদার আর উচ্চবংশীয় মুসলমানরা এটি তৈরী করেছিলো। মঞ্চটি অনেক বড়ো হওয়ায় সেখানে নাটক-থিয়েটার হতো, আবার সিনেমা প্রদর্শনের আয়োজনও ছিলো। মহেন্দ্র গুপ্ত, সলিল চৌধুরী, আবুল কাসেম, রহিমউদ্দীনরা এ মঞ্চে অভিনয়-সঙ্গীত পরিবেশন করতেন। ফরিদপুর চলচিত্র প্রদর্শনীর ক্ষেত্রে কিরণবালা বোস-এর নামটি জড়িয়ে রয়েছে। তিনি ছিলেন বিখ্যাত রায় বাহাদুর সতীশ মজুমদারের মেয়ে। খুব অল্প বয়সে বিধাব হয়ে রাজেন্দ্র কলেজের কাছে তার বাবার বাড়িতে থাকতেন। এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করতেন। এমনকি বাবার জমিদারির দেখভালের দায়িত্বও ছিলো তাঁর ওপর।

’অরোরা কটিজ’ নামে ৫০-এর দিকে সিনেমাহল চালু হয়। সেই কালে সিনেমা হলকে ‘টকিঘর’ আবার ’বায়োস্কোপ’ দেখানোর ঘরও বলতো অনেকে। পরে পাকিস্থানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ময়েজ মঞ্জিলের লাল মিয়া সাহেবের প্রয়াত মেয়ের স্মৃতি রক্ষায় সিনেমা হলটির নামকরণ করা হয় ‘মায়া সিনেমা’। এরপর হাতবদল হয়ে দীর্ঘদিন ‘ছায়াবানী’ সিনেমা হল নামে এটিই ছিলো ফরিদপুর শহরের মানুষের চিত্তবিনোদনের একমাত্র ভরসাস্থল।‘বনলতা’ নামে পরবর্তী সময়ে আরো একটি সিনেমা হল চালু হয়। বৃষ্টি নামলে পৌর-সুপার মার্কেটের কচুরি ডোবার পানি উপচে সিনেমাহলের মধ্যে ঢুকতো। সামনের সারির অনেকেই প্রস্রাব করতো সেখানে দাঁড়িয়ে-ই।

সেই আওয়াজ পিছনের রিয়ার স্টল থেকে শোনা যেতো। কেউ কেউ আমাদের অঞ্চলের স্থানীয় ভাষায় চিৎকার দিতো— ‘ওই শালারা পানির মধ্যে মুতশ ক্যা।’ ওপরের টিন চুইয়ে দেয়ালের গা বেয়ে নিচে চলে আসতো বৃষ্টির পানি। দর্শকের সব রাগ-ক্ষোভ অশ্লীল গালি হয়ে বের হতো ম্যানেজারের উদ্দেশ্যে। ম্যানেজার ভুলু বাবু ছিলেন অত্যন্ত স্মার্ট ও সুবেশধারী ভদ্রলোক। কিন্তু তাকে গালি শুনতেই হতো।এমনকি ট্রেনে বিদ্যুৎ চলে গেলেও ফরিদপুর অঞ্চলের যাত্রীরা আচমকা তাঁকেই গালি দিতো—‘ওই ভুলু কারেন্ট দে।’ শহরের বিদ্যুৎ চলে গেছে, সে দোষের অংশীদার তাঁকেই করা হতো প্রায়ই।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক
মোবা:০১৭১১-১৯৭৫৮২

Print Friendly, PDF & Email


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ