সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১০:৫২ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
E-Paper-12.10.2021 E-Paper-15.08.2021 নড়াইলে কঠোর লকডাউন চলছে, আক্রান্তের হারও হু হু করে বাড়ছে থেমে নেই মৃত্যু কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টারে গুলি: ‘জাকারবার্গ’কে খুঁজে দিতে পুরস্কার ঘোষণা! মাগুরার মহম্মদপুরে যুবকের বস্তাবন্ধি লাশ উদ্ধার। ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশু কন্যার জীবন বাঁচাতে সাহায্য কামনা অনুষ্ঠিত হলো তথ্য কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল কর্মশালাঃ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মীদেরকে সরকার ও জনগণের মধ্যে “সেতুবন্ধ” বললেন সচিব নগরকান্দায় বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ আহত -১৫ কুষ্টিয়ায় আলোচিত ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা আটক আলফাডাঙ্গায় আ’লীগ নেতার বাড়িতে হামলা গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ

শারদীয় দূর্গাপূজা

-সিরাজুল ইসলাম মিয়াঃ

ঘুম যখন ওর ভেঙ্গে গেছে তখন বেশ খানিকটা রাত, সকাল হতে অনেক দেরি। এপাশ ওপাশ করছিল। ঘুম কি আর আসে। এমনি অবস্থায় কখন যেন চোখের পাতা দুটো এক হয়ে গেছে। এরই মধ্যে ওর কানে এসে লাগে জুড়ির তালে ওদের উঠানের পাশ দিয়ে নাম গাইতে গাইতে দক্ষিণ পাড়ার দিকে যাচ্ছে চৈতন্য দাদু (গোঁসাই)। এই শ্রীহদ্দি গ্রামে বা আশে পাশের এলাকায় গোঁসাই কে জানে না বা চেনে না, এমন কোন লোক নেই। লোকালয়ে সূর্য উদয়ের পূর্বে সকলকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা তার জীবনের প্রথম এবং প্রধান কাজ। সৎ এবং সাধু বলে এলাকায় একটা বিশেষ পরিচিতি আছে। প্রবীন এই মানুষটিকে সবাই শ্রদ্ধা করে, ভালোবাসে। কেউ বলে গোঁসাই কাকু, কেউ বলে গোঁসাই দাদু, কেউ বলে গোঁসাইজী। পরহিত পরকল্যাণ, রোগ শোক যেখানে যাই ঘটুক না কেন, চৈতন্য গোঁসাইকে সেখানে সকলের আগে দেখা যাবে। সংসার বলে কোন বালাই আবিল তার জীবনে নেই। পরার্থে তার জীবনটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন এ চলার পথের শেষ প্রান্তে। সুরভী ছটফট উঠে চলে আসে সন্দিপদের উঠানে। তারপর ওর রুমের পাশে। চুপি চুপি ডাকে।

এদিকে ভয়ও করছে যদি কাকিমা শুনে ফেলে তাহলে আর রক্ষে নেই। সন্দিপ আর সুরভীদের বাড়ী পাশাপাশি। দুজনে একই সাথে পড়ে প্রাইমারীতে। দু’জনের মাঝে খুব ভাব। কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারে না। পড়াশুনা, খেলাধুলা, উঠাবসা সবই ওদের এক সিঁড়িতে। দু’জনের মাঝে কথা হয়েছিল খুব ভোরে উঠে তমালদের বাগান থেকে কারো না জানার আগে সব শিউলী ফুলগুলো ওরা কুড়িয়ে নিয়ে আসবে। খুব তাড়াতাড়ি ওরা দুজনে চলছে। অন্ধকারটা বেশ গাঢ় রয়ে গেছে। ওরা চলছে তো চলছেই। ভয় ভীতি ওদের স্পর্শ করতে যেন ভয় পায়। একটা সমস্যার কথা চিন্তা করে ওরা বেশ ঘাবড়িয়ে যাচ্ছে। যদি পুতুল, অঞ্জলী ওদের যাওয়ার আগে এসে পড়ে। এরই মধ্যে সামনে বেধে গেছে চৈতন্য গোঁসাই। ওরা মোটেও বিচলিত হলো না। গোঁসাই একগাল হেসে দিয়ে বলেন, এই যে দিদি মণি, তোমরা এতো সকালে কোথায় যাচ্ছ ? এখনও যে ভোর হতে অনেক বাকি। সুরভী গোঁসাইয়ের হাত ধরে বলে, দাদু তুমি বোধ হয় ভুলে গেছ আজকের দিনের কথা। আজ যে ষষ্ঠি, তারপর সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী, দশমী।
না গো দিদি ভুলি নাই। তোমার যে সব কটি দিনের নামই মুখস্থ।
বারে মুখস্থ থাকবে না! গোঁসাই ওদের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে, ভগবান তোমাদের মঙ্গল করুন।
তারপর একটু দম নিয়ে গোঁসাই আবার বলেন, -তা এতো সকালে তোমরা কোথায় যাচ্ছ। ওরা দুজনেই বলে ওঠে, -ওই তমালদের ফুলের বাগান আছে না; ওখান থেকে ফুল কুড়াতে যাচ্ছি। মা দূর্গা ঘাটে উঠার সাথে সাথে আমরা পূজার দেওলে উঠে সবার আগে দেবীর চরণে পূজা দেব। গোঁসাই একটা টানা নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন- ভগবান তোমাদের মনের বাঞ্ছা পূর্ণ করুন। দূর্গা-দূর্গা-দূর্গা। সন্দিপ একটু সরে এসে বলে- দাদু তুমি যেন কাউকে বলে দিও না।
আশ্বিন মাস। চন্দ্রকলার নিখুঁত হিসাব নিয়েই চলে শারদীয় পূজার আয়োজন সমস্ত সনাতন ধর্মের মানব কূলের মাঝে। এই ক্ষণে মহাশক্তি দেবী মহামায়া স্বর্গের সোপান বেয়ে নেমে এসেছিলেন মত্ত জগতে। বিষয় একটাই অশুভ শক্তিকে নির্মুল করে শুভ শক্তিকে প্রতিষ্ঠা করা।
স্বর্গরাজ্যে বাস করতেন দেবতা আর দৈত্যকূল। এই দুই মহাশক্তির মধ্যে ক্ষমতার প্রভাব নিয়ে দীর্ঘকাল এক ভীষণ দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। দেবতারা বলেন, এ স্বর্গরাজ্য আমাদের। কেবল মাত্র আমাদেরই স্থায়ীত্ব থাকবে এখানে। প্রতি উত্তরে দৈত্য কুলেরা বলেন, আমাদের শক্তিকে খর্ব করার মতো কোন শক্তি স্বর্গরাজ্যে সৃষ্টি হয় নাই। আর হবেও না। এ নিয়ে চলল অনন্ত কাল ধরে শক্তির রশি টানাটানি। তখন অসুর রাজ মহিষাসুর চিন্তার রাজ্যে ডুব দিয়ে একটা উপায় খুঁজে পেলেন। তিনি শক্তির পূজায় শক্তিকে আয়ত্তে এনে অমরত্ব লাভ করে স্বর্গরাজ্য জয় করবেন। অসুর রাজ শুরু করলেন ব্রহ্মাকে পাওয়ার জন্য আরাধনা। দিনের পর দিন পরবাস, বছরের পর বছর নিরলস সাধনা চলল অসুর রাজের ব্রহ্মাকে পাওয়ার জন্য। এই সাধনার একমাত্র অভিলাষ অসুর রাজ্যের শুধুমাত্র ধরায় অমরত্ব লাভ করা। ব্রহ্মাদেব অসুরের ডাকা সাড়া দিলেন। অসুর পৃথিবীতে অমরত্ব লাভের বাসনা ব্রহ্মার কাছে দাবী করলেন। অসুরের এই দাবী ব্রহ্মা মানলেন না।
এরপর অসুর রাজ কঠিন আর কঠোর ব্রত নিয়ে তপস্যায় মগ্ন হলেন। তিনি শীর মাটিতে ঠেকিয়ে পদমূল উর্দ্ধে তুলে সাধনার পথ অবলম্বন করলে ব্রহ্মা এই তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে অসুরকে এই বর প্রদান করলেন যে, তার মৃত্যু কোন মানব বা কোন দেবতার হাতে হবে না। একমাত্র নারী শক্তি ছাড়া কেউ তাকে বধ করতে পারবে না। এই অমর বর অসুর রাজ লাভ করে স্বর্গ থেকে দেবতাদের বিতাড়িত করলেন। শুধু তাই নয় স্বর্গ, মর্ত্ত, পাতাল রাজ্যে এক মহা ধ্বংসের তান্ডব লীলা সৃষ্টি করলেন। দেবতারা দৈত্যদের এ অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে প্রথমে ব্রহ্মার কাছে যান এই অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য। যেহেতু তিনি নিজেই অসুরকে বর দিয়েছেন সেহেতু তিনি এ বর ফিরিয়ে নিতে অক্ষমতা প্রকাশ করে দেবতাদের ফিরিয়ে দেন। দেবতারা নিরুপায় হয়ে শিব ঠাকুরের নিকট যান। তিনি জানান ব্রহ্মা নিজে যে বর দিয়েছেন, সে বর খন্ডন করতে আমি অক্ষম। অবশেষে দেবতারা আসেন বিষ্ণুর কাছে। তিনি ওই একই মত প্রকাশ করলেন।

নিরাশার মাঝে অবশেষে দেবতারা মর্ত্ত জগতে ফিরে আসেন। দৈত্যরাজ্যের এই ধ্বংস যজ্ঞে সারা পৃথিবী ধ্বংসস্তুপে পরিণত হবার উপক্রম হলো। তখন এই বিশ্ব ব্রহ্মান্ড রক্ষা করার জন্য ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব এই তিন মহাশক্তি একসাথে মিলিত হন। এই মিলনের ফলে এক অপূর্ব “তেজরশ্মির” সৃষ্টি হয় এবং মাঝ থেকে বেরিয়ে আসেন মহাশক্তি, মহামায়া অর্থাৎ দূর্গাদেবী। সৃষ্টিকূলকে রক্ষা করার জন্য এবং সৃষ্টি মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার জন্য দেবী দূর্গা অসুরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধে অসুর পরাজিত হন। সৃষ্টিকূল রক্ষা পায় ধ্বংসের হাত থেকে এবং বয়ে আসে এক অনাবিল শান্তির বারতা। সেই থেকে মর্তজগতের সনাতন ধর্মের মানবকূল তাদের নিবেদিত প্রাণের অর্ঘ ঢেলে দিয়ে আসছে এই শারদীয়া দূর্গাপূজার শুভক্ষণে। প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে ঘুরে ঘুরে আসে শারদীয় দূর্গাপূজা। এই দিনক্ষণ গুলো আর একেই কেন্দ্র করে ওই দুটি অবুঝ হিয়ার নৈকট্যের বন্ধন প্রাণের গভীরে আরো গভীর করে জমতে থাকে।
এ দ’ুটি পরিবারের বৈষম্য বয়ে গেছে বিভিন্ন দিকে। সুরভীর বাবা অর্থশালী ব্যবসায়ী বড় লোক। তাছাড়া পাশাপাশি বাড়ি এত দুরত্বের আরো একটি কারণ। সন্দিপের বাবা একজন মিলের শ্রমিক, নিরীহ শান্তশিষ্ঠ। তিনটি ছেলে, একমাত্র সন্দিপ লেখাপড়ার জন্য স্কুলে স্থান পেয়েছে। অর্থনৈতিক কারণে আর দুজন লেখাপড়ার জগতে স্থান করার সৌভাগ্য হয় নি। সন্দিপের বাবা অনিল মজুমদার। অভাব অনটনের তাড়নায় হিমশিম খেয়ে উঠেন প্রতিনিয়ত সংসার চালাতে। এমতাবস্থায় কি করে তিনি ওদের পড়াশোনার অর্থ যোগান দেবেন। সন্দিপের মা বিভিন্ন ভাবে যা কিছু পয়সা সংগ্রহ করতে পারে তা সন্দিপের লেখাপড়ার পিছনেই ব্যয় হয়ে যায়। সন্দিপ তখন বোঝে মা বাবার কঠোর দরিদ্র অবস্থা। একদিন সন্দিপ মায়ের পাশে এসে দাঁড়ায়। মা বুঝতে পারেন সন্দিপ হয়তো কিছু বলবে- কিছু বলবি বাবা। -হা মা; -অত ভাবছিস কেন। বলে ফেল।
মায়ের মুখের দিকে করুণ দৃষ্টিতে চেয়ে বলে, -মা আমার আর লেখাপড়া করে কাজ নেই। আমি যদি বাবার সাথে কাজ করতে পারি তাহলে বাবার কিছুটা উপশম হবে এবং সংসারের কিছুটা স্বচ্ছলতা ফিরে আসবে। দীপু আর শীপু দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ওদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেই। মা সন্দিপের মুখের দিকে চেয়ে থাকেন। সন্দিপের চোখ দুটো তখন ভিজে উঠছে। তিনি সন্দিপকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন- ও কথা মুখে আনিসনে বাবা। তোর বাবার ইচ্ছা, যত কষ্টই তার হোক না কেন তিনি তোকে আরো কিছু দুর এগিয়ে নিয়ে যাবেন। তুই এখন যা। তোর বাবাকে খাবারের জন্য ডেকে নিয়ে আয়। সেই সকালে বেরিয়ে আর ফিরার নাম নেই। নারায়ন, নারায়ণ।
সন্দিপ চলে যাওয়ার পর হঠাৎ চৈতন্য গোঁসাই এসে সন্দিপের মায়ের সামনে হাজির হয়ে একগাল হেসে দিয়ে বলেন,
-তা মা বেশ কয়েকদিন তোমাদের এদিকে ফিরতে পারিনে- তা দিনকাল কেমন চলছে মা। সন্দিপের মা একটা প্রণাম করে বলেন,
-ভগবান যে ভাবে চালিয়ে নিচ্ছেন সেইভাবেই যাচ্ছে বাবা ঠাকুর।
-হাঁ মা সবাই তার ইচ্ছা। তিনি যাকে যে ভাবে ইচ্ছা তাকে সেই ভাবেই রাখেন। এই মা, দেখি তোর হাতটা। বলে সন্দিপের মায়ের হাতে কতকগুলো টাকা গুঁজে দিলেন, আর কাঁধের বোচকার মধ্যে থেকে একটা শাড়ী ও দীপু ও শীপুর জন্য জামা প্যান্ট তুলে দেন। সন্দিপের মা অবাক হয়ে চেয়ে বলেন- এসব কেন করতে গেলেন বাবা!
ও কথা বলিস না মা; আমি যাই, ওদিকে আবার ও পাড়ায় রমেশের ছেলেটা
অসুখে পড়ে আছে, আমাকে সেখানে যেতে হবে মা। দূর্গা-দূর্গা-দূর্গা।
অশ্র“সিক্ত নয়নে তার চলার পথের দিকে তাকিয়ে বলতে থাকেন তিনি, ঠাকুর তুমি মানুষটাকে দীর্ঘজীবি কর।
সুরভীর মা কল্যানী দেবী খুব শান্ত সহনশীলা রমনী। এত বড় বিরাট সংসারের তিনি একাই হাল ধরে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। সন্দিপকে তিনি খুব ¯েœহ করেন, ভালোবাসেন। মাঝে মধ্যে তিনি যে সন্দিপের প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়ান নি এ কথা বলা যায় না। তবে ইদানিং সে ওদের মেলা-মেশাটা একটা ভিন্ন রুপ নিয়েছে এ জিনিসটা তার দৃষ্টি এড়ায় নি। তবে তিনি এ নিয়ে মোটেও বিচলিত হননি। ভাবেন শেষ পর্যন্ত একটা উপায় হয়তো হবে। কিন্তু কল্যানী দেবীর ভাবনায় এখানে এসে ছেদ পড়ে, সুরভীর বাবার কথা চিন্ত করে। বড় উগ্র মেজাজের লোক তিনি। ধীর স্থিরতা কিছুই নেই বললে চলে প্রবীর বাবুর। টাকা, পয়সা, ধন, সম্পদের কমতি নেই কোন খানে। এসবের প্রভাবে যেমন তাকে অহংকারী করে তুলছে তেমন হটকারিতাও আছে যথেষ্ট। একদিন স্ত্রীকে ডেকে বলেন- বর্তমানে মেয়ের গতিবিধি, চালচলন আমার কাছে খুব একটা গ্রহণ যোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। এদিকে কি তুমি লক্ষ্য করেছ ?
এ উদাসীনতা যেন শেষ পর্যন্ত বানরের গলায় মুক্তার মালা না হয়। সুুরভীর মা এ কথার কোন উত্তর না দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মেয়ের প্রতি মায়ের এ উদাসীন ভাব দেখে প্রবীর বাবু মেয়েকে নিয়ে মা ভাবছে তা সঠিক বলে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে নিলেন। তবুও ব্যাপারটা পুরোপুরি বুঝার জন্য স্ত্রীর প্রতি ভরসা না করে যেতে লাগলেন। যখন তিনি ব্যাপার সম্পূর্ণ সত্য বলে বুঝলেন, তখন একদিন স্ত্রী কল্যানী দেবীকে ডেকে বললেন, -আমার ধারণা কখনও ভুল হতে পারে না। মেয়ে তোমার এখন আর সহজ নেই। সে সন্দিপের সাথে প্রেমে মেতে উঠেছে।
-এসব তুমি কি বলছ ? -যা সত্য তাই বলছি। যদি প্রমাণ চাও তাও দিতে পারি। এসব মন্তব্য আর মান সম্মানের প্রশ্ন নিয়ে আমি তোমার সাথে তর্কে যেতে চাইনে। তুমি পরিস্কার ভাষায় মেয়েকে জানিয়ে দিও, বাড়িতে রেখে আমি আর তাকে পড়াশোনা করাব না। গ্রীষ্মের ছুটি শেষ হলে সে তার মাসীর বাড়িতে চলে যাবে এবং ওখানে থেকেই ওখানকার কলেজে পড়াশুনা করবে।
-এ কি সিদ্ধান্ত নিলে তুমি!
-কথা বাড়াতে চেষ্টা করো না। আমার সিদ্ধান্তই চুড়ান্ত বলে মনে রাখবে। কল্যাণী দেবী কপালে হাত তুলে চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, হায়রে ভগবান, এ তুমি কি করলে।
সুুরভী পাশের রুমেই ছিল। বাবার এ কঠোর আর নির্মম কথাগুলো নিজ কানে শুনতে পেলো। সমস্ত শরীর ওর ঘেমে উঠল। বুকের মধ্যে অসহ্য বেদনার ঝড় বয়ে যেতে লাগল। ধপ করে বিছানায় শুয়ে অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল, ওগো সন্দিপ তুমি একবার এসে দেখে যাও তোমার সুরভী এখন কোথায়। সন্ধ্যায় মা এসে দেখলেন তখন সুরভী বিছনায় পড়ে কাঁদছে। তিনি সুরভীকে অনেক কিছূ বুঝালেন, বললেন কাঁদিসনে মা। অদৃষ্টে ভগবান যা লিখেছেন তাই হবে।
গ্রীষ্মের ছুটি শেষ হতে আর মাত্র ছয়দিন বাকি। কথাটা যে সন্দিপ শুনে নাই তা নয়। কিন্তু কি বা তার করার আছে। সুুরভীকে কাছে টেনে নেবার কোন যোগ্যতাই তার নেই। সুরভী বড় লোকের মেয়ে। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় বিচার হবে অর্থের মাপকাঠিতে। অর্থের কাছে সন্দিপের সমস্ত প্রাণের দাবি তলিয়ে যাবে। পৃথিবীতে ধনবান লোকের অভাব নেই, কিন্তু অভাব আছে হৃদয়বান লোকের।
আজ সুুরভীর বিদায়ের শেষ দিন। কাল ও চলে যাবে। একসময় বিষন্ন হৃদয়ে মায়ের পাশে এসে দাঁড়াল। চোখে জল। মায়ের পাশে এসে মিশে বলে- মা, কাল তোমাদের ছেড়ে, শুধু তোমাদেরই নয় শৈশবের সব কিছু ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আমাকে একটু অনুমতি দাও আমি সন্দিপের সাথে কিছু কথা বলব। মায়ের চোখেও জল, তিনি মর্মে মর্মে বুঝতে পারেন সুরভীর হৃদয় গভীরের ব্যাথাটা। কাছে এসে সুরভীকে বুকের মাঝে টেনে নিয়ে বলেন, তোদের হৃদয়ের এ শ্বাশত ভালোবাসার টানের পথে একটু বাধ সাধব না মা। তুই যাবি। ওকে যা বলার তা নির্ভাবনায় বলবি।
খানিকটা রাত হয়ে গেছে। সন্দিপ ওর রুমে টেবিলে মাথা গুজে বসে আছে। হৃদয়ে ওর গভীর ব্যাথার ঝড় বইছে। কাকে বলবে-কে শুনবে ওর কথা। সুরভী এসে কখন যে ওর পাশে দাঁড়িয়েছে, তা ও টের পায় নি। সুরভী ধীরে ধীরে হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলে, আমি চিরদিন তোমার। যেখানে যত দূরেই থাকি, কেউ আমাকে কোন দিন স্পর্শ করতে পারবে না। জীবন এখানেই শেষ নয়, আরো অনেক দূর আমাদের চলতে হবে। সন্দিপ ওর চোখের দিকে চেয়ে বলে, সুরভী তোমার অদর্শন বেদনায় আমার জীবনকে যে গুছিয়ে রাখতে পারব না। ¯্রােতে ভাসা শেওলার মতই আমাকে ভাসতে হবে। -জীবনের আবেগ অনুশোচনা এড়িয়ে চলার নামই জীবন। সন্দিপ চেয়ে আছে সুুরভীর মুখের দিকে। ঝর ঝর করে ঝরছে চোখের জল। হাত দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে সুরভী,
-তুমি অমন করে চোখের জল ফেললে আমি যে সইতে পারি না সন্দিপ।
-জানি সুরভী, আমরা কোনদিন কেউ কাউকে ফাকি দেইনি। তোমাকে নিয়ে জীবনের সমস্ত স্মৃতি ভুলে থাকতে পারব, শুধু একটা মাত্র স্মৃতি; যা প্রতিনিয়ত আমাকে কাঁদায়ে ফিরবে। সেই শৈশবের শিশির ঝরা প্রাতে তোমার সাথে শিউলী ফুল কুড়িয়ে দেবালয়ে দেবীর চরণে অর্ঘ দেওয়া। বছরের প্রথম থেকেই সে কটা দিনের প্রতিক্ষায় থাকি কবে সেই শারদীয় দিনে মহামায়ার আগমনের সাথে আমাদের মিলনের ক্ষণটি পাব। এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সুরভী ওর দিকে। আর নিজেকে সামলিয়ে রাখতে পারল না। কাছে এসে ওর বুকের মাঝে মুখ রেখে কেঁদে বলে, তুমি আর বলো না। কেন যে তোমাকে জীবনের সাথে জড়িয়ে নিয়েছিলাম ?
-সুরভী, তোমার তো তবু একটা অবলম্বন আছে। কিন্তু আমি …………..।
থাক সুুরভী, কষ্ট কোন দিন ফুরাবে না। রাত অনেক হয়ে গেছে, এবার বাড়ি ফিরে যাও। করুণ আর ভিজে কন্ঠে বলে সুরভী,
-আমাকে একটু এগিয়ে দাও। কতকাল যে তোমার হাত ধরে চলি না। সেই যে ছোট বেলায় দুজনে হাত ধরে চলতাম। এখন ………….।
সুরভী, সামনে শারদীয় দূর্গাপূজায় বাড়ি আসবে না ?
-আসব বৈকি কি। আমাকে যে আসতেই হবে। দেবীকে সামনে রেখে তোমার ও দুটো পায়ে প্রণাম করব। সুরভী …………।
হাঁ সন্দিপ, এ আমার প্রতিজ্ঞা।
মা বাবার আদেশ নির্দেশ অনুরোধ কোনটাই রাখতে পারে নাই সন্দিপ। লেখা পড়া ছেড়ে দিয়ে একটা ছোট খাট কাজ নিয়েছে ও। ছোট ভাই দু’টোকে লেখাপড়া করাবে এটাই ওর প্রধান প্রচেষ্টা। দীপু, শীপু লেখাপড়ায় বেশ মেধাবী। ওর বাবার শরীরটা ভেঙ্গে গেছে। সন্দিপ অনেকবার বাবাকে অনুরোধ করছে, বাবা তুমি আর কাজে যেও না। আমার যা আয় তাতে আমাদের সংসার চলে যাবে। বৃদ্ধ বাবা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে ওর মুখের দিকে। অনেক কষ্টে বলেন-
-এসময়ে তোর থাকার কথা ছিল কলেজে। কিন্তু সন্দিপ সবই আমর ব্যার্থতা। সন্দিপ বলে-
-থাক বাবা ওসব কথা। তুমি স্নান করে খেয়ে নেও গে।
সন্দিপ ধীরে ধীরে ওদের উঠানের এক কোণে এসে দাড়ায়। এখান থেকে সে সুরভীকে দেখতে পেত। কতছলে সুরভী এসে দেখা দিত। এখন সব ফাঁকা। সবই আজ কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
মা রাতে এসে সন্দিপের রুমে ঢোকেন। দেখে অন্ধকারে খোলা জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরের দিকে চেয়ে আছে। মা বুঝতে পারেন সবকিছু। কিন্তু কি বলবেন তিনি। মাথায় হাত দিয়ে ডাকেন,
-এমন করে কি দেখছিস বাবা।
-কই মা, অন্ধকারে কি কিছু দেখা যায়।
-যায় বাবা। মনের যে আলো জ্বলে থাকে সে আলোতে অতীতের সব স্মৃতি ছবির মত ভেসে আসে। হা বাবা, কাল সুরভীর মা আমাকে ডেকে নিয়ে অনেক কথাই বললেন। সুরভীকে এমনি ভাবে বাড়ি থেকে সরিয়ে দেওয়া, তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তুমি জানো দিদি, ওই লোকটা একঘুয়ে আর বদমেজাজী। কাজেই আমার নীরব থাকা ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না। কি বলব দিদি, আজ প্রায় তিনমাস গত হয়ে চলল মা আমার চলে গেছে; অভিমান করে চলে গেছে একটি বারও আমার কাছে ফোন দেয় নি, বলতে বলতে তিনি কেঁদে ফেললেন। তারপর অনেকক্ষণ নীরব থেকে কি যেন ভাবলেন, পরে আবার বললেন, -দিদি তুমি কি জান, সুরভী সন্দিপের সাথে ফোনে কথা বলে কিনা। আমি জানি দিদি ওরা একে অপরকে ভালোবাসে। তিনি একটু সোজা হয়ে দৃঢ় স্বরে বললেন, দিদি সন্দিপকে বলো ও যেন সুরভীকে ফোন দিতে ভুল করে
না। তবে জান দিদি আমার মন বলছে কি যেন একটা অশুভ ঝড়ো হাওয়া সব শেষ করে দিয়ে যাবে। নীরবে শুনছিল সন্দিপ। তারপর অনেক কষ্টে বলে,
-মা তুমি কাকীমাকে বলো সুরভী অনেক মানষিক যন্ত্রনা নিয়ে দিন কাটাচ্ছে। তিনি যেন একবার গিয়ে মেয়েটাকে দেখে আসেন।
ধীরে ধীরে আরো একমাস পার হয়ে গেল। কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে। পূজার ছুটি। সুরভী বাড়ী এসেছে। কিন্তু দেখা হয়নি ওর সাথে। মা খেয়াল করছেন সুরভীকে। শরীর অবয়ব একেবারেই ভেঙ্গে গেছে সুরভীর। মায়ের মন বড় ভয় করছেন সুুরভীকে নিয়ে। কিন্তু কি করবেন তিনি। স্বামী প্রবীর বাবুর মতের বিরুদ্ধে কিছুই করবার নেই তার। আজ ষষ্ঠি। দেবী খাটে উঠবেন। মন্দিরে চলছে শিশু, কিশোর, যুবক, বৃদ্ধ সকলের আনন্দ। বেশ একটু দুরে, এগিয়ে আসছে সুরভী। কিন্তু হঠাৎ সামনে সন্দিপ।
-একি সুরভী। কখন এলে ? -পরশু। তোমার সাথে দেখা করতে পারি নি। বুঝতেই পারছ। আমাকে ভুল বুঝ না।
-ছিঃ ওসব কথা থাক। তোমার শরীরের একি অবস্থা। ফোনেতো একটুও বলনি। হেঁসে দিয়ে সুরভী বলে, -নিজের চেহারাটা কি আয়নায় দেখেছ।
-আমি পুরুষ মানুষ। একরকম পুষিয়ে নিতে পারব।
-থাক ওসব কথা। আমি বিজয়া দশমীর দিন সন্ধ্যার পর তোমার কাছে যাবো। আমি যাই।
শুভ শান্তি প্রতিষ্ঠা দেবীর পূজারীবৃন্দের কাছ থেকে অর্ঘ দেওয়ার শেষ কাল। দেবীর সম্মুখে চলছে আরতী। চোখ জুড়ান মন ভুলানো এ অপূর্বক্ষন। হাতে, কপালে, শিরে, ধুপদানী নিয়ে ছন্দের তালে, নৃত্যের নৈপুন্যে দর্শকরা বিমোহিত। এমনি মনমুগ্ধকরক্ষনে সন্দিপ সুরভীকে নিয়ে এসে দাঁড়ায় ওদের আঙ্গিনার কোলে শিফালী গাছের ছায়ে। দুজন চুপচাপ। কে কি বলবে মনের কিনারায় খুজে পায় না। দুজনে মনের গভীরে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছিল অনেক কথা। কত আশার প্রদীপ। কিন্তু কোথায় যেন সব হারিয়ে গেছে। শেষে সুরভী নিরবতা ভেঙ্গে বলে, -কেমন ছিলে ?
-কেমন থাকতে পারি সুরভী, সেকি তুমি বুঝ না।
-বুঝি। কিন্তু ভাষা পাইনে বুঝবার। তোমার সাথে ফোনে কথা বলি, এ থেকে মাসীমা অনুমান করেছেন, আমি কাউকে ভালোবাসি।
-তুমি কি তাকে কিছু বলেছ ?
-না। তবে তিনি আমাকে বিমনা দেখে অনেকদিন অনেকবার অনেক প্রশ্ন করেছেন। শুধু মাথা নিচু করে চোখের জল ফেলেছি। তিনি হয়ত বুঝতে পেরেছেন, তার অনুমান সত্যি। খুব বড় মনের মানুষ, মায়েরই মত।
-সত্যি সুরভী। উনি খুব উদার মহত। তিনি চান আমাদের দুজনের জীবনটা যেন দুদিকে ভেসে না যায়। সুরভী কথা বলতে পারে না। সন্দিপ বুঝতে পারে ওর মনের অবস্থা। তাই কথার মোড় ঘুরিয়ে বলে, তোমার নিশ্চয় মনে আছে সেই প্রথম দিনে তমালদের বাগান থেকে শিউলী ফুল কুড়িয়ে তোমার ফ্রকে পোটলা করে রেখেছিলাম। সেই থেকে আমার একটা খেয়াল চেপেছিল। শিউলী ফুলের গাছের প্রতি। এই গাছটি যখন লাগাই ঠিক সেই মুহুর্তে দেখি গোসাই দাদু এসে হাজির। তিনি হেঁসে দিয়ে বলেন,
-আরে সন্দিপ ভালো করে লাগা। জল দিস কিন্তু। দেখবি তিন বছরের মাথায় ফুল এসে গেছে। হয়েছে তাই। তাত্ত্বিক পুরুষ। বাক্য সিদ্ধি। সুুরভী মাথা উঁচু করে বলে, আমার কি সৌভাগ্য শারদীয় দূর্গাপূজায় তোমার আঙ্গিনায়, তোমার শিউলী তলে, তোমার পাশে দাঁড়িয়ে একি স্বপ্ন না বাস্তব। সামনে দেখ দেবালয়। কত আবেগ উচ্ছাসে নিজেদের মন প্রাণ ঢেলে দিয়েছে পূজারীবৃন্দ। আমার মন কিন্তু এখন নীরব, নিশ্চল। শুধু মন বলছে সারা জীবন এমনি করে তোমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও তোমাকে পাবার আশা মিটবে না। অনেকক্ষন দুজনেই নীরব। কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলছে। শেষে সুরভী একটু সরিয়ে এসে বলে, দাড়াও, বিজয়াকে স্মরণ করে তোমাকে একটা প্রণাম করি। সুরভী কন্ঠে আঁচল জড়ায়ে সাষ্টাঙ্গে একটা প্রণাম করল। সন্দিপ দুহাতে ওকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরল। তারপর একমুঠো শিউলী ওর খোপায় জড়িয়ে দিল। পরে জড়ানো কন্ঠে বলে সুরভী, -সন্দিপ বিজয়াকে সামনে রেখে আমার সবটুকু তোমাকে দিয়ে গেলাম। কোনদিন যদি ঝড়ো হাওয়ায় হারিয়ে যাই আমার জন্য কেঁদোনা।
-সুুরভী ………..।
-হাঁ সন্দিপ গ্রীষ্মের ছুটিতে আমি না এলেও আমর মৃত দেহ তোমার কাছে আসবে।
সুরভী এসেছে ঠিকই কলেজে। কিন্তু মনটা কোন অজানায় যেন ফেলে এসেছে। বাড়ি থেকে আসার সময় বাবা বলে দিয়েছে, ফাইনাল পরীক্ষার পর তোমার বিয়ে এবং সব চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সুরভী মাথা নিচু করে শুধু বলে দিয়েছে’ -বাবা তোমার এ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আমর জীবন মরণ সন্ধিক্ষণ।
পড়াশোনার প্রতি কোন আফসোস নেই ওর। সব কিছু মনে হয় বিষসদৃশ। কাল থেকে ওর ফাইনাল পরীক্ষা শুরু। রাস্তায় চলতে পারে না। পথ চলার সময় নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। সেদিন ট্রাফিক পুলিশ ওর অবস্থা লক্ষ্য করে ওকে ধরে নিয়ে কলেজ প্রাঙ্গণে পৌঁছে দিয়ে এসেছে এবং বলে মা, তুমি পথ চলতে কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাও। একটু সাবধানে সতর্ক হয়ে পথ চলো। রাত তিনটা। সন্দিপ জেগে আছে আর ওকেই ভাবছে।
হঠাৎ ফোনটা বেজে উঠলো। সুুরভী …….. হা আমি সুরভী। তোমাকে কয়েকটি কথা বলব। সন্দিপ আমার যে কি হয়েছে কিছুই ভালো লাগেনা, পৃথিবীটা যেন মিথ্যে। মাসীমার বাসা থেকে কলেজ মাত্র দশ মিনিটের পথ। পথ চলতেই চোখে পড়ে একটা মন্দির। মন্দিরটি দেখতেই আমার মনে পড়ে যায় তোমাকে নিয়ে সব স্মৃতির কথা। তারপর আর পথ চলতে পারি না। দিকহারা হয়ে পা টানতে টানতে পথ চলি। জানিনা ললাট লিপিতে কি লেখা রয়েছে। কাল থেকে পরীক্ষা। ভাল থেকো। সন্দিপের সমস্ত দেহ ঘেমে ওঠে। কাঁপতে কাঁপতে বলে সুরভী তুমি ফিরে আসো। শেষ বারে মত সুরভীর কাছ থেকে একটি কথাই ভেসে আসে,
-“আমি না গেলেও আমার মৃত দেহ তোমার কাছে যাবে”।
আজ পরীক্ষার শেষ দিন। পরীক্ষা শেষ হলে হল থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা বাড়ায় সুরভী। অজ¯্র চিন্তার ভীড় সুরভীকে প্রায় জ্ঞান শূন্য করে ফেলেছে। ও যেন দেখতে পাচ্ছে, কচি কলার গাছে ঘেরা বিয়ের আসর, সোনা-দানা নানা অলংঙ্কার, রাঙ্গা চেলী দেওয়া শাড়ী, কপালে চন্দন আঁকা বধু, বেসিনী, চার পাশে কোলাহল আনন্দ মুখর, তারপর শুভদৃষ্টি, সাতপাক মালাবদল, উঃ-এত ভয়ানক আর্ত চিৎকার। রাস্তার লোকজন জড় ওকে ঘিরে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে মাথায়। কে একজন ছুটে এসে বলেন, -এ যে আমাদের পাশের বাসার রানী পিসিমার বাসার মেয়ে।
হাসপাতালের জরুরী বিভাগে শুয়ে আছে সুরভী সজ্ঞাহীন। মাঝে মাঝে চেতন পায়। সবাই এসেছে। বাকি নেই কেউ। শুধু মাত্র সন্দিপ নেই। একবার চেতন পেয়ে বলে, -বাবা, তোমার চুড়ান্ত সিন্ধান্ত শশ্মানের মাঝে মিলিয়ে নিও। মা, সন্দিপ কি আসে নাই, ওর সাথে আর দেখা হলো না। ও অভিমান করে এলো না মা। মা, আমার একটা শেষ অনুরোধ, আমার পাশে ওকে আসতে দিও, ফেলতে দিও চোখের জল। একবার এদিক ওদিক তাকায় সুরভী। তারপর ধীরে ধীরে ওর চোখের পাতা এক হয়ে যায়। মা শুধু একবার চিৎকার দিয়ে বলেন, অভিমান করে চলে যাসনে। -মা একবার ফিরে আয়।
ওইতো শশ্মানে জ্বলছে সুরভীর শব দেহ। একটু দূরে প্রিয় বেদনায় পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সন্দিপ। আশা নেই, ভরসা নেই, সুখ নেই, শান্তি নেই। আজ ও এক বেদনা বিধুর সর্বহারা মানুষ। মনের অজান্তে বলে উঠছে, কি চাইলাম আর কি পেলাম। এ আমার আজকের জিজ্ঞাসা নয়, অনন্ত কালের এ আমার জীবন জিজ্ঞাসা। পথে প্রান্তরে খুজে ফিরব আমার এ জীবন জিজ্ঞাসার উত্তর। কিন্তু পাব কি ?
কালের প্রবাহে আসে বছর, আসে মাস, আসে দিনক্ষণ। সেই সাথে বয়ে নিয়ে আসে মানুষের জীবনের জমাট বাধা স্মৃতির ডালি। এমন কতগুলো ব্যাথা যা সব মুছে গেলেও ওই ক্ষতগুলো নতুন করে চলার পথে মনের মনি কোঠায় এসে স্পর্শ করে। সন্দিপ ভাবে, অতীতকে আর স্মরণের পাতায় টানবেনা। অতীত চিরদিনই অতীত। কিন্তু ভাবনার সাথে কি ও কথাটির মিল হয় ?
আজ বিষয়া দশমী। দেবী চলে যাবেন এ সৃষ্টিকূলের দৃষ্টির অন্তরালে। আরোহন করবেন স্বর্গরাজ্যে। ওইতো পুকুরের অপর পাড়ের ঘাটলায় এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে মন্দিরের দিকে সন্দিপ। যেখানে বসে সুরভীকে নিয়ে রাতের প্রহর কাটাত। চেয়ে আছে সন্দিপ। আলোর বন্যায় ঝলমল মন্দির। পুজারীবৃন্দের চলছে সাধ, সাধ্য, সাধনা। সন্দিপের আর দেবীর কাছে চাওয়া পাওয়ার কিছুই নেই। ওর সব চাওয়া পাওয়া যেন শশ্মানের ভষ্মের সাথে মিশে আছে। মন্দিরের পাশ থেকে ভেসে আসে এক হৃদয় বিদারক সঙ্গীতের সুর। এ সঙ্গীতের প্রতি কথা যেন ওর জীবনের সাথে মিশে আছে।

ছিল সে এমনি বিজয়া তিথী
সাতটি বছর আগে
সেদিনের সে কি ছায়া ছবি সম
আজো মোর মনে জাগে
সাতটি বছর আগে।

এমনি শারদ রাতে
তোমায় আমায় দেখা হলে সেই
আঙ্গিনায় জোসনাতে
এমনই শারদ রাতে।

কন্ঠে তোমার আচল জড়ায়ে
প্রণাম করিলে মোর দুটি পায়ে
তব অধরে ছিলগো মধুর হাসিটি
আধো লাজ আখি পাতে
এমনি শারদ রাতে।

তখন বাতাসে আঙ্গিনার পাশে
শেফালি পড়িছে ঝরে
কি জানি সহসা আখি দুটি তব
কুলে কুলে এলো ভরে
কানে কানে তুমি কহিলে আমায়
এতো সুখ মোর সহিবে কি হায়
মোর বুকে ছিল মুখখানি তব
হাত খানি ছিল হাতে
এমনি শারদ রাতে;
সাতটি বছর আগে।

আবার এসেছে বিজয়া দশমী
সাতটি বছর পরে
কত কথা আজ নয়নের জলে
ফিরে ফিরে মনে পড়ে
সাতটি বছর পরে।

এমনি শারদ রাতে
তোমার সে কথা বুঝিবা দেবতা
শুনেছিল সেই ক্ষণে
কে জানিত মোর বিজয়া তিথী
পোহাবেনা এ জীবনে।
মোর একটি কুসুম, ক্ষণিকের ভুলে
পাষাণ দেবতা নিয়ে গেল তুলে
আমার বিজয়া হয়ে গেল সারা
বুকভরা বেদনাতে
এমনি শারদ রাতে।

আজ ভরা জোসনায়, সেই আঙ্গিনায়
দাড়ায়ে শেফালী তলে
তব নাম ধরে ডাকি যতবার
আখি ভরে ওঠে জলে
নিভে গেছে দীপ থেকে গেছে বাঁশি।
হারায়েছে গান ফুরায়েছে হাসি
আমার প্রতিমা নিয়েছে বিদায়
স্মৃতি পড়ে আছে সাথে
এমন শারদ রাতে
সাতটি বছর পরে।
সঙ্গীতের শেষের চরণটি শেষ হওয়ার সাথেই অশ্র“ সজল চোখে সন্দিপ চাইতেই দেখে সামনে গোসাই চৈতন্য দাদু। তিনি পলকহীন দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন ওর দিকে। অনেকক্ষণ নীরবে থেকে তিনি বলেন,
-আমি জানতাম ওর ব্যাথা, ওর হৃদয় আজ তোকে এখানে নিয়ে আসবে। আর কাদিস নে। কথাগুলো বলে তিনি নীরব হয়ে গেলেন। কাছে এসে আবার বলেন, -অমনি করে হাত বাড়িয়েছিস কেন?
-তুমি কি দেখতে পাচ্ছনা দাদু আমার হাতের শিউলী ফুলগুলো। আমার সুরভী আসবে আমার কাছে, ফুলগুলো ওর হাতে তুলে দিয়ে ওকে নিয়ে যাব মায়ের চরণে অর্ঘ দিতে। একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাসে তিনি বলেন,
-ওরে অবুঝ, তুই কি শুনতে পাচ্ছিস নে সুরভী তোর হাত থেকে ফুল নিয়ে স্বর্গের সোপানে দাড়িয়ে বলছে,
-সন্দিপ প্রতি শারদীয়ায় আমি তোমার স্মৃতি কাতর হৃদয়ের পাশে আসব।

Print Friendly, PDF & Email


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ