বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১, ০৩:৫৬ অপরাহ্ন

শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের শুরুর দিনগুলো

-এড.গাজী শাহিদুজ্জামান লিটনঃ

বিরাহিমপুর পরগণা, সাজাদপুর পরগণা আর কালীগ্রাম পরগনার জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে ১৮৯১ সালে শিলাইদহে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিরাহিমপুর পরগণার সদর কাচারী শিলাইদহই ছিলো তাঁর জমিদারী পরিচালনার প্রধান কার্যালয়। প্রয়োজনে তিনি সাজাদপুর ও কালীগ্রাম পরগণার সদর কাচারী পতিসরে যেতেন।

১৯০১ সাল পর্যন্ত তিনি ঠাকুর পরিবারের পক্ষে এ তিনটি পরগণার জমিদারী পরিচালনা করতেন। এর মধ্যে ১৮৯৮ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত শিলাইদহ কুঠিবাড়ীতে তিনি ছিলেন সপরিবারে। কুঠিবাড়িতে সংসার পেতে বসতেই প্রথমেই দেখা দিল ছেলে মেয়েদের শিক্ষা সমস্যা। সেই ১৮৯৮ সালে কবির বড় মেয়ে মাধুরীলতার বয়স বারো, বড় ছেলে রথীন্দ্রনাথের দশ, মেঝ মেয়ে রেনুকার আট, ছোট মেয়ে মীরার বয়স ছয়, এবং সবার ছোট ছেলে শমীন্দ্রনাথ চার বছরের শিশু।

সে সমস্যা সমাধান করতে ঘরেই স্কুল খুলে বসলেন কবি। কবির শিষ্য প্রমথনাথ বিশীর ভাষায় “বাল্যকালে বিদ্যালয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতা কবি ভোলেননি, তাই তিনি নিরস্ত হয়েছিলেন ছেলে মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে। কিšু— শিক্ষাতো দিতে হবে। তখন প্রতিষ্ঠা করলের গৃহ বিদ্যালয়। শিলাইদহে সপরিবারে বাস উঠে গেলে গৃহ বিদ্যালয় উঠে গেল। উঠে গেল না বলে বলা উচিত উঠে এলো শান্তিনিকেতনে।

১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে কবির পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিভৃতে ঈশ্বরচিন্তা ও ধর্মালোচনার উদ্দেশ্যে বোলপুর শহরের উত্তরে শান্তিনিকেতন আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯০১ সালে সেখানেই রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠা করেন শান্তিনিকেতন ব্রহ্মবিদ্যালয়।
এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পূর্বে কবি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর কাছে লেখা চিঠিতে তার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন এভাবে- “বন্ধু………… শান্তিনিকেতনে আমি একটি বিদ্যালয় খুলিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিতেছি। সেখানে ঠিক প্রাচীনকালের গুরুগৃহ বাসের মতো সমস্ত নিয়ম। বিলাসিতার নামগন্ধ থাকিবে না, ধনী-দরিদ্র সকলকেই কঠিন ব্রহ্মচর্যে দীক্ষিত হইতে হইবে। উপযুক্ত শিক্ষক কোনোমতেই খুঁজিয়া পাইতেছি না।”

শান্তিনিকেতনের শিক্ষকবৃন্দঃ
পরবর্তীতে কবির ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯০১ সালের ৭ পৌষ ব্রহ্মবিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। নানা সময়ে এই বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে যোগ দিয়েছিলেন- শিলাইদহ কাচারীর কর্মচারী জগদানন্দ রায়, যিনি হোমিওপ্যাথিও জানতেন; আদি ব্রাহ্মসমাজ থেকে আনা হয় সংস্কৃত শিক্ষক পন্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণভ। শুরুর দিকেই রেওয়াচান্দ নামের একজন ইংরেজি শিক্ষক যোগ দেন।

পরবর্তীতে তিনি অনিমানন্দ স্বামী নাম গ্রহণ করে কোলকাতায় উপকন্ঠে শান্তিনিকেতন ধারার একটি স্কুল খুলেছিলেন। তিনি রোমান ক্যাথলিক ছিলেন, আর নিয়ম কানুনের বিষয়ে ছিলেন খুব কড়া। অন্যদিকে কবি ছিলেন স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার পক্ষে। অচিরেই এই দুই আদর্শের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হল এবং রেওয়াচান্দ বিদায় নিতে বাধ্য হলেন। বাংলা শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন সুবোধ চন্দ্র মজুমদার।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরে এসেছিলেন হরিচরণ বন্দোপাধ্যায়, ভুপেন্দ্রনাথ সান্যাল, সতীশ চন্দ্র রায়, অজিত কুমার চক্রবর্তী প্রমুখ। আরো পরে যোগ দিয়েছিলেন মোহিতচন্দ্র সেন, ক্ষিতিমোহন সেন, জ্ঞানেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়, সন্তোষচন্দ্র মজুমদার, কালিদাস বসু, নেপালচন্দ্র রায়, সুধাকান্ত রায় চৌধুরী, প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ, ধীরেন্দ্র মোহন সেন, তেজেশচন্দ্র সেন, সি.এফ.এন্ড্রুজ, ডব্লিউ ডব্লিউ পিয়ারসন প্রমুখ বিদগ্ধজন। আর যখনই সুযোগ পেতেন কবি স্বয়ং শিক্ষক হিসাবে অত্যন্ত উৎসাহের সাথে দায়িত্ব পালন করতেন।

শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষাগ্রহণ যাতে আনন্দদায়ক ও আকর্ষণীয় হয় সেজন্যে কবি নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করতেন। শান্তিনিকেতনের শিক্ষার্থীদের কথা ভেবেই তিনি কিছু ট্রেক্সটবুক/পাঠ্যবই রচনা করেন। উদ্বোধনী দিনে ব্রহ্মবিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন কবির পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর সহ মোট পাঁচজন। কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ মন্তব্য করেছেন-“প্রথম দিকে শান্তিনিকেতনের ইমেজ ছিল কিছুটা সংশোধনমূলক। অভিভাবকরা তাদের দুষ্ট সন্তানদেরই এখানে পাঠাতেন।”

শান্তিনিকেতনের শিক্ষানীতিঃ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিক্ষানীতির মূল কথা ছিল শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ মানুষ করে গড়ে তোলা। শান্তিনিকেতনের শিক্ষক অজিত কুমার চক্রবর্তীকে এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন- “আমাদের বিদ্যালয়ের এই একটি বিশেষত্ব আছে যে, বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে অখন্ডযোগে আমরা ছেলেদের মানুষ করতে চাই। বিদ্যালয়টি ছিল সম্পুর্ণ আবাসিক। কবি এটিকে সর্বদা আশ্রম বলে উল্লেখ করতেন। তিনি পাঠ মুখস্ত করা এবং তাকে পরীক্ষার খাতায় উগরে দেয়াকে শিক্ষা মনে করতেন না। তিনি চেয়েছিলেন- “আশ্রমে জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য ও সম্পূর্ণতা সাধন করিয়া তাহাকেই ছাত্রদের শিক্ষার ক্ষেত্র করিয়া তুলিতে হইবে। তাহারা যাহা কিছু শিখিবে এইখানেই যথাসম্ভব তাহার প্রকাশ ও প্রয়োগের সুযোগ করিয়া দেয়া কর্তব্য।

অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সম্যক নৈপুন্য-সাধন; দৃষ্টি ও মনন শক্তির সম্যক অনুশীলন; তরুলতা পশুপক্ষী ও বিশ্বপ্রকৃতির বিচিত্র ব্যাপার সম্বন্ধে ঔৎসুক্য ও অনুরাগের চর্চা; প্রতিদিনের ব্যবহার্য দ্রব্য প্রস্তুত করিবার প্রণালী সম্বন্ধে অভিজ্ঞতা লাভ; বাসস্থান সুন্দর সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যকর করিয়া রাখার অভ্যাস; বেশভূষা, স্নান, আহার ব্যায়াম ও বিশ্রাম প্রভৃতি শরীর সম্পর্কীয় সমস্ত ব্যবস্থা যাহাতে পরিস্কার, পরিপাটি, সুসংযত, সুশোভন ও শক্তিসাধক হয় সেইরূপ নিয়মের সতর্ক অনুসরণ করা; ছাত্রদের পরস্পরের প্রতি, গুরুজনের প্রতি, অতিথিদের প্রতি, কর্মচারী ও ভৃত্যদের প্রতি ব্যবহারে বিণয় রক্ষা; যাহাতে সামাজিকতাবৃত্তির বিকাশ হয়, সেইরূপ অনুষ্ঠানের প্রবর্তণ।”

কবি চাইতেন- “ওরা যদি নিজের কুটির নিজে বেঁধে, নিজের কাপড় নিজে বুনে, নিজের কাগজ নিজে তৈরী করে, নিজের বানানো কালীতে লিখে কাজ চালাতে পারে তো ভালো হয়।” তিনি প্রকৃতির প্রণালী অনুসরণ করে শিক্ষাদানের কথা বলেছেন অর্থাৎ করতে করতে, দেখতে দেখতে অজান্তেই শিশুরা শিখে যাবে। “প্রকৃতির প্রণালীর গুণ হচ্ছে এই যে, প্রকৃতি তার শিক্ষাকে কিছুতেই বিরক্তিকর করে তোলে না।”
এভাবেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছেলে-মেয়েদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসাবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখতেন। যদিও তার এই ভাবনার বাস্তবায়নে প্রকৃত সহযাত্রী হিসাবে পেয়েছেন খুব কম মানুষকেই।

তথ্যসুত্রঃ
১। শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ- প্রমথনাথ বিশী
২। শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের শিক্ষাদর্শ- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
৩। On the edges of time- রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। (অনুবাদ; আমার বাবা রবীন্দ্রনাথ, কবির চান্দ অনূদিত)
৪। উইকিপিডিয়া।

Print Friendly, PDF & Email


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ