বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১, ০৩:৩৪ অপরাহ্ন

প্রভু! ক্ষমা করো, সত্য ভাষণঃ ২২.১০.২০২০

মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিঞা

আমার বড় মামার বড় ছেলে সাজ্জাদ আলী বাদল। বর্তমানে কানাডা প্রবাসী। একটি বাংলা টিভি চ্যানেলের চেয়ারম্যান ও সিইও। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। মামা নওশের আলী টিপু মিঞা ছিলেন মাহমুদ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। আওয়ামী লীগের বিখ্যাত নেতা এবং আমার দেখা সর্বাধিক যোগ্য ও ন্যায় নীতিবান সর্বজন গ্রহণ যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তাঁর ৭ (সাত) সন্তানের বড় সন্তান বাদল। অসাধারণ এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। গোপালগঞ্জ শিল্পকলার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল যখন দেশে বসবাস করতো।

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। বাদল তখন গোপালগঞ্জ এস.এম মডেল হাই ইস্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম (রহ:) এর জন্মদিন উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমী গোপালগঞ্জ আয়োজন করেছে সাত দিন ব্যাপি বিশেষ অনুষ্ঠানের। বাদল ঐ অনুষ্ঠানে কয়েকটি নজরুল গীতি পরিবেশন করবে। উদয়ন রোডের বাসায় চলছে রিহার্সেল। আমি এবং বড় মামি আম্মা (বাদলের মা) খাটে বসে বাদলের গান শুনছি। বাদল হারমোনিয়ামে সুর তুলছে “নিশি ভোর হলো জাগিয়া, পরান ও প্রিয়া”। বাসায় তখন বিদ্যুৎ নেই। প্রচন্ড গরম। মামি আম্মার হাতে তালের একটি ‘হাত পাখা’। আমি ¯েœহধন্য বাদলকে জিজ্ঞেস করলাম, বলতো নিশি মানে কি? বাদল জবাব দিলো, দাদাভাই জানিনা তো?

মামি আম্মা তাঁর হাতের পাখা দিয়ে শুরু করলেন বাদলকে পিটানো। মামি আম্মাকে আমি সারা জীবনে অতটা রাগতে কখনো দেখিনি। মুহুর্তেই হাতের পাখাটি দেয়াশলাইয়ের কাঠির মতো টুকরো টুকরো হয়ে গেল। অবশিষ্ট থাকলো পাখার হাতলটি! আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ঘর নীরব। বাদল রক্তাক্ত! মনে হলো অপরাধটা সম্ভবত: আমিই করে ফেলেছি। বাদল ক্ষত বিক্ষত হবার জন্য আমিই দায়ী। মামী আম্মার মুখে একটাই শব্দ নিশি অর্থ জানোনা, গান গাইবে! বাদল লেখাপড়ার পাশাপাশি কিছুদিনের জন্য সাংবাদিকতা শুরু করলো। আগুনের ফুঁলকি কাপড় দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। সে তার গন্তব্যে পৌঁছে যায়। বাদল মনে মনে মজবুত হয়ে দাঁড়াতে তৎপর হলো। শেষ পর্যন্ত কোনো এক সোনালী সকালে সুদুর আমেরিকা পাড়ি জমালো।

আমাদের বিশ্বাস বাদল সেখানে পরমানন্দেই ছিল। প্রায় আধাকুড়ি বছর আমেরিকা থেকে চলে যায় পার্শবর্তী দেশ কানাডায়। অনেকেই বলে থাকেন, আমেরিকা হলো সব অপকর্মের উৎপত্তিস্থল। তাই তার মন না টিকার কারণও হতে পারে আমেরিকাতে। বাদল মহা তবিয়তেই কানাডার টরেন্টোতে বসবাস করছে।

কিছুদিন আগে তার একমাত্র জীবিত ফুফু (আমার মা) কে দেখার জন্য আমাদের বাড়ীতে এসেছে। আমরা ভাই-বোনেরা এক জায়গায় মিলিত হলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। আমি দুষ্টুমি করে বাদলকে প্রশ্ন করলাম, লোকে বলে তুই নাকি দেশে থাকতে সকালে দুইশো মিথ্যা কথা না বলে নাস্তা খেতে রাজী হইতি না? কানাডায় কি মিথ্যা বলতে হয়? মিথ্যা বলার সুযোগ আছে?

বাদল অট্টহাসি দিয়ে বললো দাদাভাই; ওখানে মিথ্যা বলার কোন সুযোগ নেই, প্রয়োজন ও হয় না। ২২ বছর ওখানে আছি, আজ পর্যন্ত এমন কোনো সমস্যা উপস্থিত হয়নি, যেখানে মিথ্যা বলার দরকার আছে। কানাডিয়ান জনগণ মিথ্যা বুঝেনা, মিথ্যা বলে না।
বাদল বললো,আমার টিভি চ্যানেলের সম্প্রচারের ব্যাপারে দেশে আসার কিছু দিন আগে গেলাম সংশ্লিষ্ট অফিসে। দুঃখের বিষয় কোনো সমস্যা নিয়ে আজ পর্যন্ত প্রধান কর্মকর্তার মুখোমুখি হতে পারিনি। আগেই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

আমি গিয়ে জানতে চাইলাম আমার কাজের ব্যপারে। ভদ্রলোক সুন্দর করে বলে দিলেন ঐ ব্যক্তি আপনার কাজ করবেন। আমি গিয়ে গুডমর্নিং বলার আগেই তিনি আমাকে সম্বোধন করে তার সামনের চেয়ারে বসতে বলেই প্রথমে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার পছন্দ কি, চা অথবা কফি? আমি সভাব সুলভ কফির কথা বলতেই তিনি পূণরায় জানতে চাইলেন, আমি আপনাকে কতোটা সেবা দিয়ে উপকার করতে পারবো? কাজটা আমার কাছে বেশ কঠিন মনে হচ্ছিল। কানাডিয়ান ভদ্রলোক আমার কফি শেষ হবার আগেই কাজটা সমাধান করে বিনীত ভাবে বললেন, আমার গাফিলতি বা ব্যর্থতার কারণে যদি আপনার মূল্যবান সময় নষ্ট করে থাকি, তবে আমাকে ক্ষমা করবেন।

বাদলের মুখে যখন আমি এ কাহিনী শুনতে ছিলাম তখন আমি দিব্যি খাওয়া ভুলে গেছিলাম। মনে হচ্ছিল আমি বোধহয় কোনো নাটক দেখছি সরাসরি বা লাইফ অনুষ্ঠান।

সারা দুনিয়া যখন মহামারী কনোনায় আক্রান্ত তখন কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর ভাষণে বিশ্ববাসীর তাক লেগে গেছে। ঐ ছোট ভাষণটি অনেকেই হুবহু মুখস্ত বলে ফেলতে পারে। মনে হয় বিশ্ববিখ্যাত কোনো নাট্যকারের নাটকের মনোমুগ্ধকর ডায়লগ এগুলো। কোনো রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানের শ্রেষ্ঠ কার্যকরী ভাষণ।

বাংলাদেশ শতকরা ৯০ জন মুসলিমের দেশ। ইসলাম আমাদের ধর্ম। ইসলামে মিথ্যা বলা হলো সমস্ত পাপের জননী বা মা। অথচ আমাদের মধ্যে মিথ্যার প্রচলন সব চাইতে বেশী। মিথ্যা, ধোকাবাজি, পরনিন্দা, পরের জিনিস আত্মসাৎ আমাদের জাতীয় রোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের দেশের মহান নেতা একবার দুঃখ করে বলেছিলেন, “মানুষ পায় স্বর্ণের খনি আর আমি পেয়েছি চোরের খনি”। আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি প্রায় অর্ধশত (৪৯) বছর অথচ আমরা বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হতে পারিনি। অথচ আমাদের এই সম্ভাবনাময় দেশে কিসের অভাব রয়েছে? আমারতো মনে হয় আমাদের কিছুরই অভাব নেই। অভাব রয়েছে শুধু স্বভাবের ও উন্নত মন-মানসিকতার।

সম্প্রতি যে ঘটনা দেশবাসীকে চরম ভাবে নাড়া দিয়েছে এবং ব্যথিত করেছে তা হলো ফরিদপুর জেলার ছাত্রলীগ সভাপতি নিশানের অপকর্ম!! নিশানের মা-বাবা অনেক সাধ করে ছেলেকে শিক্ষিত বানানোর জন্য মহাবিদ্যালয়ে পাঠিয়েছিলেন। গা-গতরে ভালো থাকায় এক পর্যায়ে ক্ষমতাশীন দল আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মী থেকে এক পর্যায়ে সভাপতির পদ লাভ করে। সাথে সাথেই শুরু করে স্বেচ্ছাচারিতা। তার আঙুলের ইশারায় সম্পূর্ণ ব্যবসায়ী মহল মহা আতঙ্কে থাকতো। মুখ খোলা তো দুরে থাক তার নামটা উচ্চারণ করার মতো সাহস কারো ছিল না। সম্প্রতি নিশানকে গ্রেফতার করা হয়েছে দুই হাজার কোটী টাকা বিদেশে পাচার করার ঘৃণিত অপরাধে। রিমান্ডে দোষ স্বীকার করেছে। ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ বহিষ্কারে কিছুই যাবে আসবেনা। যে ক্ষতি হবার তাতো হয়েই গেছে। মরা ছেলের জন্য কেঁদে আর কি লাভ!?

নিশানের এই হিং¯্রতা দুই এক দিনে হয়নি। দুই হাজার কোটী টাকা শুধু বিদেশেই পাঁচার করেছে। আর দেশে কি পরিমাণ আছে! দেশÑরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনী, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা তারা কি করেছিলো? তারা কি নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে বেতন, বোনাস, ভাতা খেয়েছেন? আসলে কেউ কিছুই করেনি! যা করার করেছে নিশান গংরা। তারা ঠিকমতো যা করার করে আখের গুছিয়ে নিয়েছে।
ছোট বেলায় গল্প শুনেছি মগের মুল্লুকের। চোখে দেখার সৌভাগ্য হয়নি এতোদিন। একটু একটু অনুভব করা শুরু করেছি মাত্র। ফরিদপুরের বরকত, রুবেল ভ্রাতৃদ্বয় দেখিয়ে দিয়েছে ফরিদপুরবাসীকে। তারা এখন শ্রীঘরে। অপকর্মে বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ এখন সারা বাংলাদেশের আলোচ্য বিষয়। লোমহর্ষক কাহিনীর সৃষ্টিকর্তা। তার অপকর্ম সমগ্র পুলিশ বাহিনীকে হেয় প্রতিপন্ন করে ছেড়েছে। শাহেদ করিম ও ডা: সাবরীনা চিকিৎসা নামের ক্যান্সার। যেন গোঁদের উপর বিষফোঁড়া।

ইসমাইল হোসেন সম্রাট; সেতো ক্যাসিনোর সম্রাটই ছিল। তার দাপটে ঢাকা শহর কাঁপছে বছরের পর বছর।
জি.কে শামীম যা করেছে, তা দেশবাসী জেনেছে।
পর্দার নীচে খ্যামটা নাচ। দেখিয়ে দিয়েছে পাপিয়া গংরা।

সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী বাহাদুর বলেছেন (দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১৬.০৯.২০২০) সাংবাদিকরা লেখা পড়া জানেনা। পরে বলেছেন এরা বিএপি সমর্থিত সাংবাদিক! এ কথা নিয়ে লেখার মতো এতটা কুসময় আমার নেই। শুধু বলবো উনি জানলেন কি করে ঐ বিদ্যাহীন সাংবাদিক (!?) সাহেবরা বিএনপি’র সমর্থিত? আর তার কোন ব্যারোমিটার দিয়ে শিক্ষার মান যাচাই-বাছাই করলেন? মন্ত্রী বাহাদুর এত অল্প সময়ে সব সাংবাদিকের লেখা পড়া মেপে ঝুপে ফেললেন? আসলেই আমাদের ফাঁটা কপাল! আমরাই বুঝতে পারিনি। আমাদের প্রতিমন্ত্রী কতোটা যোগ্যতা সম্পন্ন!

দীর্ঘদিন যাবত সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। বিশেষ করে কোমলমতি বাচ্চারা হাঁপিয়ে উঠেছে তাদের পাঠশালা বন্ধ থাকার কারণে। তাই সখ হয়েছে বাচ্চাদের খিঁচুড়ি নামক খেঁচোড়ী খাওয়াতে। উনারা ১০০০ (এক হাজার) জনকে ঐ খেঁচোড়ী রান্না শিখাতে (প্রশিক্ষণ নিতে) বিদেশ পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কারণ স্বরূপ বলা যেতে পারে এই বাংলাদেশের ছেলে-মেয়েরা জীবনে কোনো দিন ডাল ও চালের সংমিশ্রণে রান্না করা খেঁচোড়ী খাওয়া তো দূরের কথা, চোখেও দেখেনি। এমন কী তাদের “ফোটিন্থ জেনারেশন” (চৌদ্দগোষ্ঠী) ও দু’চেখে দেখেনি!

এই মুখরোচক সংবাদটি লেখা পড়ায় এতিম (প্রতিমন্ত্রীর ভাষায়) সাংবাদিকরা পত্রিকা, টিভি চ্যানেলসমূহ এবং সোস্যাল মিডিয়ায় তাৎক্ষণিক ভাবে প্রচার করে এবং বাচ্চাদের এ দুর্লভ, দুস্প্রাপ্য ও দুর্মুলের খাবার থেকে বঞ্চিত করে। এ কারণে ক্ষীপ্ত হয়ে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী বাহাদুর একটু উল্টো-পাল্টা বলতেই পারেন। ঐ দিনই তার কার্যালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি আপাতত খিঁচুড়ী রান্না প্রশিক্ষণের স্থগিতের কথা জানান দেন।

নীচের কথাগুলো লিখতে আমার ইচ্ছে করছিলো না। আমরা কোথায় আছি! বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে আমাদের হাত ধোয়া শিখাবেন! এ জন্য প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে চল্লিশ কোটী টাকা। জনা সাতেক প্রশিক্ষক আসবেন হাত ধোয়ায় উচ্চ প্রশিক্ষকপ্রাপ্ত! তাদের বেতন ও ভাতা বাবদ নয় কোটী টাকা। আসলেই আমরা কি এতটাই অযোগ্য পৃথিবীতে বসবাসের জন্য? আমরা নিজেদের হাতটা নিজেরাই ধোয়া শিখিনি!! এ সবে কি বিশ্ব দরবারে আমাদের মান সম্মান উন্নীত হবে নাকি ধূঁলোয় মিশে যাবে? জানি এ কথার জবাব দেবার মতো কেউ নেই।

জবাব তো তাদের দেয়া উচিৎ যারা মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে সারা বিশ্বাবাসীকে সামনে রেখে নির্লজ্জের মতো অকুতোভয়ে বলে ফেলেন ‘আমরা উন্নয়নে সিঙ্গাপুরের মতো যায়গায় পৌঁছে গেছি’! আমরা পরিপূর্ণ স্বাবলম্বী! আবার লজ্জায় জীহ্বায় কাঁমড় লাগে তখন যখন একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলেন, “আমরা এখন বিশ্বের অন্যান্য দেশকে টাকা সাহায্য দিচ্ছি”। তারা আমাদের কাছে টাকার জন্য আবেদন করলে আমরা সেই ডাকে সাড়া দিয়েছি। আমরা উন্নয়নের রোল মডেল।
খিঁচুড়ী রান্না শিখতে এক হাজার জনকে কোটী কোটী টাকা ব্যয় করে বিদেশে প্রেরণ এবং হাত ধোঁয়া শিখতে বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে শিখতে হয়, তা হলে ঐ উন্নয়নের রোল মডেল হওয়া কি খুব জরুরী??

এই সমস্ত দেশ দ্রোহীদের নিয়ে লিখতে গেলে সীমাবদ্ধ যায়গায় হবেনা। একনাগাড়ে গোটা কয়েক “আগামীর প্রত্যাশা’র” দরকার হবে।
আমরা প্রত্যেকেই যদি নিজ থেকে ভালো হবার চেষ্টা করি এবং ওয়াদাবদ্ধ হই, জীবদ্দশায় আমরা আর অন্যায় কিছু করবো না, তাহলেই এই দেশটাকে ভালো করা সম্ভব। আসুন! আমরা ভালো হয়ে দেশটাকে বাচিঁয়ে রাখি এবং মাথা উচুঁ করে দাড়াঁই।

লেখকঃ আগামীর প্রত্যাশা’র প্রধান উপদেষ্টা।
মোবাইল ফোন- ০১৭১৯০৮৬০৫৯

Print Friendly, PDF & Email


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ