বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১, ০৫:১১ অপরাহ্ন

প্রভু ক্ষমা করো, সত্য ভাষণ-05.06.2019

মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিঞাঃ
বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত সমধিক সমাদৃত একটি প্রবাদ বাক্য রয়েছে “আঁদার বেপারীর জাহাজের খবর”। অধিকাংশ লোকে প্রবাদটি ব্যবহার করেছে। আমিও কমবেশি দু’চার বার ব্যবহার করেছি। সম্প্রতি বাক্যটি ‘বুমেরাং’ হয়ে ফিরে এসেছে আমার দিকে। আমার পরিচিত মহল জানেন আমার পেশা সাংবাদিকতা। প্রায় অর্ধশতক বছরের অর্জন। এ সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ পেশার পাশাপাশি বন্ধুবর তারেক রহমানের অনুরোধে জাহাজের বাণিজ্যে নাম লেখাতে হয়েছিল অনিচ্ছাস্বত্ত্বে।
নাম মাত্রে মূলধন লগ্নি করার সুবাদে আমাকে মাঝে মধ্যে যেতে হয় চাঁদপুর, বরিশাল, ভোলা, নলছিটি, আমুয়া, ঝালকাঠি, মঙ্গল শিকদার, চরফ্যাশন সহ বিভিন্ন জায়গায়। এ ব্যবসা নামে “তালপুকুর আদতে ঘটিও ডুবে না’।
সুপ্রিয় পাঠক ! আমার এ জাহাজ ব্যবসা আমারই বাল্যকালের নারিকেল ব্যবসার মত। গল্পটা বলেই ফেলি।
১৯৬২ সাল। আমি তখন চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। রমজান মাস। আমার নামাজ রোজা তখন নিয়মতি অনিয়ম। কখনও পড়ি, কখনও পড়ি না।
দুপুর বেলা। ঈদ আগত। মেজ কাকা লোক দিয়ে গাছ থেকে নারিকেল পাড়াচ্ছেন। কাইনে (ছড়ায়) বড় বড় সাইজের ২২টি নারিকেল। কাকাকে বললাম, নারিকেল বিক্রি করবেন ? পাল্টা প্রশ্ন করলেন কাকা, কে কিনবে ? বললাম, আমি কিনবো।
কাকা বললেন, হ্যাঁ বিক্রি করবো। আমি বললাম, কয় টাকা দাম চান ? কাকা বললেন, তুমি বলো। বললাম দাম দেবো তিন টাকা। কাকা বললেন, দাও টাকা।
আমি দৌঁড় দিয়ে চলে গেলাম ঘরে। চাঁদ তারা মার্কা কাঁচা তিন টাকা এনে দিলাম কাকার হাতে। বলে রাখা ভালো আমি তখন সাকুল্যে ঐ তিন টাকার ই গর্বিত মালিক।
সেটা আমার জীবনের প্রথম ব্যবসা। তাই দ্রুত শুরু করলাম ব্যবসায়িক একটিভিটিজ (কার্যকলাপ)। ঘর থেকে ‘দা’ বের করে নিয়ে জোড়া বাঁধা শুরু করলাম। চার জোড়া বাঁধার পরই আমার এক চাচাতো ভাই বললো, আহাদ ভাইজান এতগুলো নারিকেল দিয়ে কি করবেন ?
আমি কিছুটা মুড নিয়ে বললাম, ব্যবসা করবো। ও বললো আমাকে সাথে নিবেন? বললাম ঠিক আছে নগদ দেড় টাকা দাও। সে বিদ্যুৎসাহী হয়ে স্থান ত্যাগ করে কিছুক্ষণের মধ্যে চলে এলো এবং আমার হাতে দিলো ৬ টা সিকি। আমি সুন্দরভাবে পরখ করে দেখলাম ওগুলো “আনিকাটা” কিনা। কারণ তখনও সে এখনকার মতোই ছিলো। আনিকাটা সিকি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পর বললাম, আমি চার জোড়া বেঁধেছি তুমিও চার জোড়া নারিকেল বাঁধো যেমন আমি বেঁধেছি। তখন শুরু হলো তার কাজের পালা, আমার বিশ্রামের। After All Partnership Business. তার চার জোড়া বাঁধাইয়ের পর শুরু হলো যৌথভাবে বাকী তিন জোড়া বাঁধাইয়ের কাজ।
বিকেল হতে না হতেই দু’জনে একসাথে রওয়ানা হলাম দুর্গাপূরে অবস্থিত তেলজুড়ী হাটে। ঐ দিন সাকুল্যে বিক্রি হলো মাত্র তিন জোড়া নারিকেল। ছয় জোড়া থেকে অবিক্রিত রয়ে গেল তিনজোড়া। বাকীগুলো বাড়ীতে স্বযতেœ রাখা। সন্ধ্যার পর বাড়ীতে বাকী নারিকেল ফিরিয়ে আনার পালা। তখন রিক্সা ভ্যান কোন কিছুই ছিলো না। শ্রীচরণেষুই একমাত্র ভরসা।
অবশেষে অবিক্রিত নারিকেল বাড়ীতে ফেরত এলো। তখন ঈদের ৭/৮ দিন বাকী। পরের দিন যথারীতি বাজারের গেলাম দু’জনে। নারিকেলের কোন খরিদ্দার নেই বাজারে। তখনও ১১ জোড়া নারিকেলের ৮ জোড়া অবিক্রিত। আমাদের মাথায় হাত। কি আর করা। এক বৃদ্ধ এসে বললো বাবা আমার কাছে পয়সা আছে তিন আনা। বললাম ১ টা নিতে পারেন ঐ পয়সায়। ক্রেতা তাতেই রাজী, আমরা মহাখুশী। অন্তত: বিক্রির বন্ধাত্ত্বটা কাটলো। পরের দিন দু’জনে জোড়া বঞ্চিত নারকেলটি আমরা খেলাম ঝোলাগুড় দিয়ে। ভাঙ্গার সময় কঠিন ফতোয়া দিল। ব্যবসার নারিকেল যেহেতু, সেহেতু অন্য কাউকে খাওয়ালে বরকত হবে না। আমি বললাম, যথার্থ। শুরু হলো গোপনে খাওয়ার পালা। যা হোক হাট আর বাজার মিলে ৬/৭ দিনে নারিকেল বিক্রি হলো ১৯ টি। মন ভয়ানক ভারাপ। পরের দিন ঈদ। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। মহা চিন্তার সাগরে নিমজ্জিত। জীবনের প্রথম ব্যবসা। বাজার মন্দা দেখে বাজার থেকে এসেই নারিকেল অবশিষ্ঠ অবিক্রিত দু’টি ভাগ বাটোয়ারা করে নিলাম দু’জনে ঈদের আগের দিন। যাকে বলা হয় চাঁদ রাত। আগামীকাল ঈদ তাই লেখাপড়ার চাপ নেই। বাবা বাড়ী ফিরে এলেই এক সাথে খেয়ে ঘুমিয়ে নেবো। দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর বাবা বাড়ী ফিরলেন। বাবা তখন ব্যবসা করতেন। খাওয়া, নামাজ শেষ করে বিছানায় শুয়ে বাবা জিজ্ঞেস করলেন বাজান তোমার নারিকেল ব্যবসার খবর কি?
আমি বাবার প্রশ্নের জবাব দিলাম ‘মলিন বদনে’ খুব একটা ভালো না। বাবার আবার পাল্টা প্রশ্ন তা কেমন। এবার আমি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে বললাম, নারিকেল মোট ২২ টি। তিন টাকা দিয়ে কিনেছি দুজনে। ১ টা খেয়েছি, ২ টা বিক্রি হয়নি তা ভাগ করে নিয়েছি। বাদ বাকী ১৯টি বিক্রি করেছি আড়াই টাকা (দুই টাকা আট আনা)। আমার বাবা অট্টহাসি দিয়ে চিরাচরিত নিয়মে বললেন, দু’জনে ছয় দিন অকান্ত পরিশ্রম করে হাটে বাজারে দৌঁড়াদৌঁড়ি করে তিন টাকা দিয়ে নারিকেল কিনে আড়াই টাকা বিক্রি! ওরেব্বাবা। এরকম ব্যবসা না করলে কি আর রাতারাতি বড়লোক হওয়া যায়!
বন্ধুগণ! ঐ দিন তিন টাকা দিয়ে নারিকেল কিনে আড়াই টাকায় বিক্রি করে ৫৭ বছর পরে এসে বুঝতে পেরেছি সে দিনের ‘আট’ আনা লোকসান আমাকে কতটা লাভবান করে দিয়েছে। আজ থেকে ঠিক ক্যালেন্ডারের হিসেবে কুড়ি বছর দুই মাস আগে আমার বাবাকে হারিয়েছি চিরতরের জন্য। বাবা চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে। ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাইহী রাজিউন। বাবা হারিয়ে গেছেন ঠিকই, কিন্তু সাতান্ন (৫৭) বছর আগের বাবার সেই হাসিটি আমার কানে সদা-সর্বদা গ্রামোফোনের রেকর্ডের মতো আজো বাজে। সেদিন যদি বাইশটি নারিকেলে ‘বাইশ’ হাজার টাকা লাভও করতে পারতাম আমি আমার বাবার হাসিটিতো লিখতে বসে পেতাম না। সেই হাসিটি যে কত বড় সম্পদ হয়ে আমার জীবনে মহামূল্যবানের কাতারে থেকে আমার সংগ্রহ শালায় গচ্ছিত আছে তা আমি জানি।
আমার জাহাজের ব্যবসা ঠিক আমার নারিকেলের মতই লাভবান। আনন্দ আছে লাভ নেই। মাঝে মধ্যে নদীমাতৃক অঞ্চলে যেতে হয় লাক্সারী জাহাজে তারপর আবার এসি ক্লাশে। যেন খাজনার চাইতে বাজনা বেশী। চাকচিক্য আছে, সেবা নেই। পাঁচশত টাকা হলে দেড় প্লেট ভাত, দুই টুকরা মুরগীর গোশত, একটু ডাল চড়চড়ি, একটা কাঁচা মরিচ, রসবিহীন ছোট এক টুকরা লেবু। তার পরেও মানুষ যায় আসে খায়। দেখার বলার কেউ এ দেশে নেই। পকেটে হাত দিয়ে যে টাকা নিয়ে যাচ্ছে না এটাই বড় কথা। কিছুদিন আগে আমি বরিশাল থেকে ঢাকায় ফিরছিলাম সুন্দরবন-৮ জাহাজে এসি কেবিনে, তিন তলায়। জাহাজের বিশেষত হচ্ছে ফার্মেসী, সেলুন, হোটেল, রেস্তোরাঁ সহ নানাবিধ সুযোগ সুবিধা সজ্জিত। জাহাজ ছাড়ার পনের মিনিট পরে সাধারণ কেবিন বা ডেকের যাত্রীদের এসি সীমানায় প্রবেশ করতে দেয়া হয় না।
স্টুয়ার্ড এসে আমার সাথে কথা বলার অনুমতি প্রার্থনা করলো। কথা বলা শুরু করলো। রাত সাড়ে সাত, সাড়ে আট ও দশটায় চায়ের কথা বলে দিলাম। আর রাত ৯-১৫ মিনিটে ডিনার। আমার রুমের সাথে সিঙ্গেল এসি রুম। রুমে ‘অনন্যা’ নামের অনন্য অসাধারণ এক ভদ্র মহিলা সোয়া তিন বছরের এক কন্যা সন্তান নিয়ে ঢাকা যাচ্ছেন। বয়স ত্রিশের দোড় গোড়ায়। ইরানী গোলাপের মতো গায়ের রং, পরনে গোলাপী শাড়ী আর ম্যাচিং ব্লাউজ। শাড়ীর চাইতে গায়ের রং বেশী উজ্জ্বল। শরীরে কাপড় কোথায় শুরু আর কোথায় শেষ বুঝা দায়। হালকা কোঁকড়ানো মাথার চুল, বাঁশীর মতো নাক, হরিণের মতো চোখ, ঢেড়শের মতো আঙ্গুল, কমলার কোয়ার মতো ঠোঁট, পিলাই চমকানো হাসি। মোদ্দাকথা তার রূপ সৌন্দর্য্য নিয়ে উপন্যাস লেখা যায়। তার নাম কে রেখেছিলেন ‘অনন্য’ তা জানিনা, তবে যিনিই রেখে থাকুন তিনি যে নারীর রূপ গবেষণায় অভিজ্ঞ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাবা-মার প্রথম সন্তান, বরিশাল শহরে বসবাস। বাবা একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। উচ্চ মাধ্যমিক পড়ার সময় ঐ কলেজের এক ছেলের সাথে প্রথমে পরিচয় তারপর প্রণয় শেষে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। স্বামীর ঘরে এসে মাষ্টার্স করেছে। স্বামী ঢাকার ইসলামপুরে কাপড়ের ব্যবসা করেন। পাতলা খান লেনের বাসিন্দা। দুই সন্তানের জননী। বড়টা ক্লাস এইটে পড়ে। আমার কেবিনের সামনে বেলকুনিতে আমার চেয়ার থেকে মহিলার চেয়াররের দূরত্ব চার হাত। মাঝখানে একটা টেবিল দু’জনের জন্য।
গরমের দিন। দু’জনেই চলন্ত জাহাজের বাতাস খাচ্ছি বাইরে বসে। কথা বলার সুযোগ খুঁজছি কিন্তু পাচ্ছি না। হঠাৎ মোক্ষম সুযোগটি হাজির হলো। স্টুয়ার্ড চা নিয়ে হাজির আমার জন্য। আমি বললাম আরেক কাপ চা দ্রুত নিয়ে আসো, তুমি না আসা পর্যন্ত আমি চায়ে মুখ দিচ্ছি না। দৌঁড়ে এক কাপ চা নিয়ে এলো। আমার টেবিলে চা রেখে সে চলে গেলো। আমি নিজেই চায়ের কাপটা ভদ্র মহিলার হাতে তুলে দিলাম। মহিলা চাচ্ছিলো না চা খেতে। কিছুটা ইতস্তত: করলেও চায়ের কাপটা হাত থেকে নিয়ে দ্রুত আমার জন্য নিক্ষেপ করলেন আস্ত একটা নিখাঁদ থ্যাংকস।
শুরু হলো আমাদের কথোপকথন। বলে রাখা ভালো ইত্যবসয়ে তিনি আমার কাছ থেকে একটা কার্ড নিতে কালবিলম্ব করেননি। ঐ মহিলার ফোন নম্বরও আমার কাছে আছে তা আমার স্ত্রী জানতে পারলে নিস্তার নেই। সপ্তাহ খানেক তরকারীতে ‘ঝাল’ বেশি হবে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। যাগ্যে পাঠকের স্বার্থে নিজের কপাল পুড়িয়ে সত্য কথাটা এতদিন পর প্রকাশ করলাম। অনন্যার মুখ থেকে অনেক সত্য কথা বেরিয়েছে অকপটে।
চৌদ্দ বছরের বিবাহীত জীবন। যতটা সুখে থাকার কথা তিনি চিন্তা করছিলেন বিয়ের আগে ততটা সুখে নেই। জোরালো দীর্ঘ নিঃশ্বাসের মাঝে সে কথাও বেরিয়ে এলো। বিয়ের পরপরই প্রথম সন্তানটা দুনিয়ার মুখ দেখে। তখন থেকেই শুরু হয়ে যায় অশান্তির জ্বালা পোঁড়া। উপঢৌকন সামগ্রী ছাড়াও চৌদ্দ বছরে বাবার বাড়ী থেকে যৌতুক হিসেবে টাকা এনেছেন সতের লক্ষ। বড় সন্তানকে শাশুড়ীর কাছে রেখে এবারও বাবার বাড়ী গেছেন টাকা আনতে। ব্যবসার উন্নতির কথা বলে টাকা আনা হয়। ব্যবসায় উন্নতি হয়েছে কি না জানি না, তবে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে প্রচুর তা বুঝা গেলো। বাবা আজকে আসতে সময় স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, পরবর্তীতে টাকার কথা বললে স্বামীর ঘরে বাচ্চা দু’টো রেখে এক কাপড়ে চলে আসবে বাড়ীতে। বাকী জীবনভর তোমাকে খাওয়াতে পরাতে পারবো আমি। বাবা আরও বললেন, তোমরা একে অপরকে ভালোবেসেই বিয়ে করেছিলে। হিসাব কষে দেখেছো পেয়েছো কি আর দিয়েছো কী ! ভদ্র মহিলা বললেন, আমার ছোট বাচ্চাটাকেও স্কুলে ভর্তি করিয়েছি এ বছর। আমার বাড়ীওয়ালী তার আড়াই বছরের বাচ্চাটাকে একটা কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি করিয়েছে তাই আমিও করালাম। তার অন্য বাচ্চাটা এবার এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছে, তাই আমার বাচ্চাটা নিয়ে টেনশনে আছি।
আমি এতক্ষণ চুপ করে শুনতেছিলাম, থামিয়ে দিয়ে বললাম বুঝতে পেরেছি আপনার মূল প্রতিযোগীতা বাড়ীওয়ালীর সাথে। আর শুনুন গোল্ডেন জিপিএ বলতে কোন রেজাল্ট আমার দেশ তো দূরের কথা পৃথিবীর কোথাও নেই। সর্ব্বোচ্চ জিপিএ-৫। এবার একটু মুখ খুলে বললেন, আমার বাড়ীওয়ালী যে বললেন! আমি বললাম, উনি হয়তো জানেন না। না হয় ক্রেডিট নিয়েছেন।
এবার জিজ্ঞেস করলাম তা দুধের বাচ্চাটাকে কোথায় কিসে ভর্তি করলেন? বললেন প্লে গ্র“পে, নামকরা এক কিন্ডারগার্টেনে। ওকে স্কুলে নেয় কে ? কথাটা মুখ থেকে বের হবার আগেই জবাব দিলো, কেন আমি। বললাম খুব সুন্দর। কখন স্কুলে নিতে হয় ? উনি সুন্দর করে বলে চললেন আমার বড় ছেলের ক্লাশ শুরু হয় সকাল সাড়ে সাতটায়, পিটি আছে। আগেই যেতে হয়, দুষ্টু প্রকৃতির তাই একা ছাড়ি না। সকাল ছয়টার মধ্যে বিছানা থেকে উঠতে হয়। হাত মুখ ধোয়া, ওয়াশ রুম, কাপড় পাল্টানো, গোছগাছ হওয়া। তাছাড়া ভাই আমার ছোট বাচ্চাটা বিছানা ছাড়তেই চায় না। বললাম, ছোট বাচ্চা এটাই স্বাভাবিক। আপনার ছোট মণিটার ক্লাশ শুরু কখন?
বললেন, আটটায় শুরু, দশটায় শেষ। বললাম তারপর কি বাসায় চলে আসেন? আরে না! কি যে বলেন। পাশেই একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে যেখানে সুন্দর করে হাতের লেখা শিক্ষা দেওয়া হয়। ওখানে ক্লাশ করে এক দেড় ঘন্টা। বারোটায় বড় বাচ্চাটার ক্লাশ শেষ হলেই বাসায় চলে আসি। তারপর দুইটায় যেতে হয় কোচিং এ। পাঁচটা পর্যন্ত থাকতে হয় সেখানে। তারপর বাসায় ফিরি। বললাম তারপর?
বড় একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, একটু চা নাস্তা কোন রকম খেয়ে সন্ধ্যা লাগতে না লাগতেই পুনঃরায় পড়া শুরু। রাত ১২ টা পর্যন্ত কমপক্ষে পড়তে হয়। একটু মুচকি হেঁসে আবারও প্রশ্ন করলাম, আপনার বর বাসায় ফিরেন কখন?
বললেন, ঠিক নেই। কখনও দশটা, কখনও প্রায় বারোটা বেঁজে যায়। এবার বললাম, আপনার শিক্ষা, ভালোবাসা, জীবন, যৌবন সবইতো বৃথা। অনন্যা বিষ্ময় মিশ্রিত সুরে জানতে চাইলেন কেন?
বললাম; দেখুন রাগ করার কিছুই নেই। এই দেখুন আপনি এম.এ পাশ করেছেন বলে একটু আগে আমাকে জানালেন। অথচ দেখুন এম.এ পাশ করেও আপনার অতি আদরের ‘প্রে গ্র“পে’ পড়–য়া বাচ্চাটাকে ও মামুলিক হাতের লেখাটাও শিখাতে পারছেন না। হাতের লেখা শিখাতেও অন্যের ধর্ণা ধরতে হচ্ছে। আপনার যোগ্যতা থাকার পরও তার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। প্রেম করে বিয়ে করেছেন অথচ সেই ভালোলাগা, ভালোবাসা আদরের স্বামী যার জন্য সতের লক্ষ টাকা বাবা মায়ের কাছ থেকে এনে দিলেন নিজ হাতে তাকে এককাপ চা বানিয়ে খাওয়াতে পারলেন না, আর না পারলেন তাকে নিয়ে নাস্তা খেতে। খাবারের কথাতো আপনার মাথায়ই আসে না। আর সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পরে স্বামী বেচারা যখন বাসায় ফিরেন তখন তার কাছে ভালো কথাটাও ভালো লাগে না।
বললাম- ছেলেরা শরীর সুস্থ্য রাখার যে প্রধান উপকরণ খেলাধূলা তা থেকে বঞ্চিত। তারাতো অচিরেই শারীরিকভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়বে। আপনার তিন বছরের বাচ্চা প্রায় কোলে থাকার কথা কিন্তু স্কুলে যেতে হয় নিয়মিত। বাচ্চা অপেক্ষা ব্যাগের ওজন আর উচ্চতা বেশী। তার শরীর ও মগজের একটা ধারণ ক্ষমতা আছে, ক্ষমতার বাইরে চলে গেলে রেলে ইঞ্জিনও বিকল হয়ে পড়ে। মহিলা একটু নরম কাটলেন। বললাম জিপিএ-৫ এর পিছনে না দৌঁড়িয়ে বরং মানুষ করার পিছনে দৌঁড়ান কাজে লাগবে। দেখেননি ২০১৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চৌদ্দ হাজার ছেলে মেয়ে ইংরেজীতে অনার্স ভর্তি হবার জন্য পরীক্ষা দিয়েছিলো তাদের প্রত্যেকেরই এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ ছিলো অথচ পাস করেছিলো মাত্র দুই জন।। বুঝুনতো জিপিএ’র ঠ্যালা। আপনারা যে বর্তমানে জিপিএ-৫ এর পিছনে দৌঁড়াচ্ছেন; না দৌঁড়াইয়া সন্তানকে মানুষ করার পিছনে দৌঁড়ান। সুস্থ্য সবল জাতি হিসেবে গড়ে তুলুন। অন্তত: দু’এক ঘন্টা খেলবে প্রতিনিয়ত। সাধারণ জ্ঞানের জন্য নতুন করে ভাবুন। সিলেবাসের বাইরেও মস্ত বড় একটা দুনিয়া আছে, সে দিকেও খেয়াল দিন। আপনার সন্তানকে জিজ্ঞেস করুন দেখবেন লা জবাব হয়ে যাবে। এটা কি আসলে কারো কাম্য! সুস্থ্য সবল জীবন, উন্নত জাতি।
বললাম আপনার সন্তানকে ন্যায় নীতিবান করার সংগ্রামে লিপ্ত হন। শিক্ষা দিন কখনও মিথ্যা বলবে না, অন্যায় করবে না, কাউকে ধোঁকা ও ফাঁকি দিবে না। ভালোর কোন বিকল্প নেই।
দেখুনতো আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের দিকে তাকিয়ে, মন থেকে শ্রদ্ধা আসে কিনা? অধিকাংশ টিচাররা নীতির মাথা খেয়ে হয়ে গেছে চিটার। ডাক্তারদের দিকে তাকান। হাতে গোনা দু’এক জন বাদে কসাইয়ের সাথে তুলনা করা যায়। ডাক্তারদের লেখাপড়া করে সার্টিফিকেট অর্জন করতে হয়, কসাইয়ের তা করতে হয় না। মূলত: একটুকুই পার্থক্য।
লোকে আমাদের হাসিমুখে গালি দেয়, “চোর চুট্টা খেঁজুর গুড়, যতো আছে ফরিদপুর”। এরপরেও আমার বাড়ী ফরিদপুর হওয়া সত্ত্বেও গত কুড়ি বছরে আমি “খাঁটি” এক কেজি গুড় খুঁজে পাইনি। লোকজনের চরিত্র একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। কি দূর্ভাগ্য আমাদের। যা হোক, জাহাজের প্রতিবেশী মহিলা আমার কোনো কথার বিরোধিতা করেন নি। সকাল বেলা একত্রে নামতে সময় শুধু মৃদু হেঁসে বললো, মাঝে মধ্যে আমি কিন্তু আপনাকে বিরক্ত করবো। আমি শুধু বললাম আচ্ছা।

Print Friendly, PDF & Email


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ