বুধবার, ২৮ জুলাই ২০২১, ০৩:৪৮ অপরাহ্ন

প্রভু,ক্ষমা করো, সত্য ভাষণ-১০.০১.২০১৭

– মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিঞাঃ

সত্যি কথা বলতে কি! পৌষ-মাঘ মাসের কণকনে শীতের সকালে লেপ মুড়ি দেয়া ঘুম থেকে জেগে পাঁচ ফোঁড়ণের গুণে গুণান্নিœত বিভিন্ন সবজীর সমন্ময়ে তৈরি ব্যাঞ্জনে উদরপূর্তী করে নাস্তা খাবার পর, ঘরের উঠানে পীঠে রোদ লাগিয়ে, কাঠের ‘জল চৌকি’ বা কেদারায় হেলান দিয়ে বড় একটা চায়ের কাপে গরম ঠোঁট পোঁড়া চায়ে চুমুক দিয়ে চা খাওয়ার নেশাটা আজ ও ছাড়তে পারিনি। আর সেই চা হবে গরুর খাঁটি দুধের চা। চায়ের উপরে মোটা দুধের সর (ক্রীম বা মালাই)স্থানাভাবে নড়তে বা সরতে পারবে না।
মন থেকে চেষ্টা করেও লোভটাকে ত্যাগ করতে পারিনি। আর সম্ভাবনা একে বারে ক্ষীণ হেতু আর ব্যর্থ চেষ্টা করা ছেড়ে দিয়েছি। এখনও চলার পথে রাস্তার পাশে ছোট হাট বাজারে গরুর দুধের চায়ের দোকান দেখলে আমার অবস্থা তেমন হয় যেমন ভাঁজা মাছ দেখলে বিড়ালের অবস্থা হয়।
চা এখন আর চা নেই। চা এখন হুক্কার পানি। বাবা-চাচাদের সময় যখন উনারা হুক্কা খেতেন তখন হুক্কায় পানি ভরতে হতো। তিন চার দিন পানি না পাল্টালে ঈষৎ হলুদ বর্ণ ধারণ করতো। স্বাদে গন্ধে এক না হলেও বর্তমানে তথাকথিত যে চা পান করা হয় হুবহু তা এ বর্ণ বা রংয়ের।
‘দুধ, চিনি, চা, পানি, এ চার উপাদানে চা হয় জানি’। চায়ে এখন মূল উপাদান থাকে না। দুধ থাকে না। ‘কেউ বলেন আমি লাল চা খাই চিনি ছাড়া’। হয়ত এমনও শোনা যাবে, কেউ বলবেন, ‘আমি দুধ, চিনি, পানি ছাড়াই চা খাই চিবিয়ে চিবিয়ে’ অথবা ‘দুধ চিনি লেকার ছাড়া চা’ খাই। আমাদের দেশটা চা উৎপাদন, ব্যবহার ও পরিবেশনের জন্য বিখ্যাত ছিল। চায়ের যায়গা দখল করেছে দুধ বিবর্জিত লাল চা। এক সময় তথাকথিত এ লাল চায়ের নাম গন্ধ পর্যন্ত দুনিয়াতে ছিল না।
ঊনিশ শতকের শেষ দিকে রাশিয়ার চেরোনো বিলে পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে। অন্যান্য জিনিসের সাথে ধ্বংস হয়ে যায় কোটি কোটি টাকার গুঁড়ো দুধ। বিশ্ব বাজারে গুঁড়ো দুধের মূল্য বেড়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই অবস্থা। ভোক্তারা অধিকাংশ গুঁড়ো দুধ খাওয়া কেউ ছেঁড়ে দিল, কেউ বাদ দিলো, কেউ কমিয়ে দিল।
চায়ের কপাল পুড়লো, চায়ের থেকে প্রথমে ধীরে পরে ক্ষীপ্র গতিতে দুধ উধাও হলো। এখন এমন অবস্থায় গিয়ে পৌছানো হয়েছে, যে কোন হাটে, বাজারে শহরে চা খাওয়ার প্রয়োজন হলে জিজ্ঞেস করতে হয়। কোথায় দুধের চা পাওয়া যায়?
চা এবং কফি পরিবেশনের কাপ আর মগের একটা আন্তর্জাতিক পরিমাপ রয়েছে। চা আমাদের দেশে উৎপন্ন হলেও ব্রিটিশরা ঘরে ঘরে বিনা পয়সায় খাইয়ে আমাদের খাওয়া শিখিয়েছে। এক সময় বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের দেশে চা কফি পরিবেশনের জন্য কাপ আর মগ আমদানী করা হতো।
বর্তমানে বিভিন্ন খ্যাত, অখ্যাত কোম্পানী চা এবং কফির সুদৃশ্য ও মূল্যবান কাপ তৈরি করলেও তা সারা জীবনের জন্য স্পর্শ বিহীন অব্যবহৃত অবস্থায় শো কেসে স্থান করে নিচ্ছে সারা জীবনের জন্য।
যদি কোন দিন বিশ্ব অলিম্পিকে প্রতারণার উপর কোনো ইভেন্ট রিকোমেন্ড করা হয়, আমার স্থির বিশ্বাস আমরা স্বর্ণ পদক জয় করতে পারবো বিনা বাঁধায়। ধোঁকাবাজি আর প্রতারণার সূ² ঢেউ গিয়ে লেগেছে চায়ের কাপে। চায়ের দোকান থেকে চায়ের কাপ একে বারে নিশ্চিহৃ হয়ে গেছে। পরিবর্তে এসেছে কাঁচের তৈরি পাত্র, যাতে চা খাওয়া হয়। ওটা না কাপ, না মগ, না বাটি। কি সূ² ধোঁকা। যেহেতু কাপে অর্ধেক চা বিক্রি করতে গেলে খরিদ্দার প্রতিবাদ করতে পারে, তাই চালাকির সাথে চীনা মাটির পরিবর্তে পরিবেশন করা হয় কাঁচ নির্মিত কাপে। সাইজে টর্স লাইটের ব্যাটারির মত চিকন ও সরু।
কাপের মাঝখানটা ভারতীয় নায়িকাদের কোমরের মত সরু। কাপের উপর নিচটা ও ভারতীয় নায়িকাদের আদলে। অর্থাৎ নিতম্ব ও বক্ষের মত।
কোমরের তুলনায় একটু ভারী। আমাদের কাপের নিচটা ও উপরটা একটু মোটা, মাঝে সরু। যাতে করে কম চায়ে কাপ ভরে যায়। কি দুর্ভাগ্য? তার পরেও কম অর্ধেক কাপ চা। পয়সা নিচ্ছে ‘এক কাপ’ চায়ের দাম। বর্তমানে ৬ টাকা। একে তো চুরি তারপর সিনে চুরি। এ যে কত বড় অন্যায়। অথচ প্রতিবাদ করার কেউ নেই। ক্রেতা বা ভুক্তভোগী কিছু বলেন না লজ্জা বা ঘৃণায়। আর দোকানী এ অন্যায়কে কিছুই মনে করেন না। অন্যায়কে মনে করে তার ‘অন্য আয়’। দিনের শেষে অবসরে দু’চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুনতো এককাপ চায়ের পয়সা নিয়ে চা দিলেন আধা কাপ। দিনে যদি ২০০ কাপ চা বিক্রি করে থাকেন তা হলে ২০০ জন ক্রেতাকে ঠকিয়েছেন। মাসে ৬০০০ জনকে ঠকিয়েছেন বছরে গিয়ে দাঁড়ায় ৭২০০০ হাজার লোককে ঠকিয়েছেন। যদি ১০ বছর কমপক্ষে দোকানদারী করেন তা হলে প্রতারণার বহর গিয়ে পৌঁছায় ৭২০০০০ (সাতলক্ষ কুড়ি হাজার) জনে কমপক্ষে।
শান্ত মস্তিস্কে, সুক্ষ জ্ঞানে ইচ্ছাকৃত ভাবে নিরপরাধ লক্ষ লক্ষ মানুষকে ঠকালেন, প্রতারিত করলেন এর জন্য কি উপর ওয়ালার কাছে আপনাকে কোনো জবাব দিহি করতে হবে না! আপনি যে ধর্মের অনুসারী হয়ে থাকেন না কেন, উপর ওয়ালার কাছে কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি কি করতে হবে না ? কি জবাব দিবেন সেদিন একবার ও ভেবেছেন কি ? আপনার স্ত্রী, পুত্র, কন্যা বা পোষ্য কেউ কি আপরাধের ভাগ নিবে ?
তা হলে কাদের জন্য ধন, সম্পদ, অট্রালিকা? আপনার যে পেশায় আপনার সন্তানকে উত্তরসূরী করে রেখে গেলেন, শিখিয়ে গেলেন, সে সন্তানতো আপনাকে অনুকরণ ও অনুসরণ করবে। যে আদরের সন্তানকে অপকর্ম শিখালেন কর্মের নামে, তার দায় ভার কি আপনার উপর বর্তাবে না? এধারা যদি অব্যাহত থাকে তা হলে জাতি কি কোনো দিন সৎ হবে? অন্যায় থেকে পরিত্রাণ পাবে? আসুন না; একবার আমরা প্রতিজ্ঞা করি, জীবনে কাউকে ঠকাবো না। প্রতারিত করবো না। মানুষের মত মানুষ হয়ে বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচার মত বাঁচি।

Print Friendly, PDF & Email


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ