শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ০১:৪৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
E-Paper-12.10.2021 E-Paper-15.08.2021 নড়াইলে কঠোর লকডাউন চলছে, আক্রান্তের হারও হু হু করে বাড়ছে থেমে নেই মৃত্যু কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টারে গুলি: ‘জাকারবার্গ’কে খুঁজে দিতে পুরস্কার ঘোষণা! মাগুরার মহম্মদপুরে যুবকের বস্তাবন্ধি লাশ উদ্ধার। ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশু কন্যার জীবন বাঁচাতে সাহায্য কামনা অনুষ্ঠিত হলো তথ্য কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল কর্মশালাঃ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মীদেরকে সরকার ও জনগণের মধ্যে “সেতুবন্ধ” বললেন সচিব নগরকান্দায় বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ আহত -১৫ কুষ্টিয়ায় আলোচিত ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা আটক আলফাডাঙ্গায় আ’লীগ নেতার বাড়িতে হামলা গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ

অপেক্ষা

-গাজী শাহিদুজ্জামান লিটনঃ
হাসানের দু’জন বন্ধু এসেছিলো আজ। হাসান আজকাল কি করছে, না করছে সেসব নিয়ে কথা উঠলো। বেদনায় নীল হলো কুন্তীর সারা মুখ। ও অবশ্য খুব চেষ্টা করলো নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে, হেসে হেসেই ওদের আলোচনায় যোগ দিতে। কিন্তু ওর হাসির পেছনে যে গুটিশুটি বসে আছে কষ্ট, তা ও কারো কাছ থেকেই লুকাতে পারলো না।
চা,গল্পগুজব শেষ করে ওরা চলে গেলো। তারপর রাজুও উঠে দাঁড়ালো। বললো- ওকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে হবে। দরজা খুলে কুন্তী রাজুকে রাস্তা পর্যন্ত এগিয়ে দিলো সত্যি সত্যি। বেদনা মানুষকে কেমন উদার আর পবিত্র করে তোলে এই মুহূর্তে কুন্তীকে দেখলে তা স্পষ্ট বুঝা যায়। রাজুকে ও একেবারে বুকের ভিতর থেকে বললো- আবার আসিস। আর খুব সাবধানে যাস, ভাই।
পুরো পৃথিবীর উপরই ভারী মায়া হলো কুন্তীর। একেবারে ছোট্ট কোনো কষ্টও ও কাউকে দিতে পারবে না এই মুহূর্তে। এই কাগজটায় যোগ দেয়ার প্রথম দিনেই রাজুর সাথে দেখা হয়েছিলো কুন্তীর। তেইশ/চব্বিশ বছরের তরুণ। দেখা গেলো, একই জেলায় জন্ম দু’জনের। তারপর………….। সে অন্য কথা, অনেক কথা।
রোজা আর ঈদের সময় ছাড়া কখন চাঁদ উঠলো, কখন ডুবলো; কবে অমাবস্যা, কবে পূর্ণিমা সে খবর রাখেনা এই শহরের কেউ। রাজু কাছের বাঁকটা ঘুরতেই আলো চলে গেলো। আকাশ আর চারপাশের অন্ধকার দেখে, আর মনে মনে একটা খসড়া হিসাব কষে কুন্তী বুঝলো আজ অমাবস্যা, অথবা কাল। আলো চলে যাবার পরও অন্ধকারে একা একা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো কুন্তী। গত আগস্টে চৌত্রিশ পেরিয়ে পঁয়ত্রিশে পা রেখেছে সে। শরীর জুড়ানো ফুরফুরে বাতাস ছাড়লো একটু পর। ঘরে ফেরার জন্য ঘুরে দাঁড়ালো কুন্তী। ঘর?!
হাসান আর কুন্তী বলতে গেলে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলো, পরিচয়ের এক যুগ পর বিয়ে। এই এক যুগ ধরে ওরা একজন আরেকজনকে দেখেছে, চিনেছে, ভালোবেসেছে। আজ বিয়ের এই চার বছর পর, ওদের সন্তান আদরের বয়স তিন পেরোনোর পর, হাসান ওকে ছেড়ে যাবারও আট মাস পর কুন্তীর হঠাৎ আজ মনে হলো হাসানকে ও কিছুই চেনেনি। অথচ, কুন্তী নিজেই কতোবার গর্বিত হয়ে বলেছে- মানুষ চিনতে আমার ভুল হয়না, দেরিও হয়না। চোখ দেখেই আমি বলে দিতে পারি……। আজ এতোদিন পরের এক সন্ধ্যায় কুন্তী আবিষ্কার করলো- হাজার বছর পাশাপাশি থেকেও একজন মানুষ আর একজন মানুষের কাছে প্রথম দিনের মতোই রহস্যময় থেকে যায়। ঘরে এসে আদরকে কোলে নেয় কুন্তী। মৌ’র সাথে এটা সেটা গল্প করে মনকে ভাসিয়ে রাখতে চায়।
যা দূর্লভ, তা যেনো পাওয়াই চাই মানুষের। “পথ চলাতেই যার আনন্দ” সেই হাসানকে জয় করবার খুশিতে স্বপ্নের মতোই কেটে গেছে কুন্তীর চারটি বছর। কি না করেছে সে হাসানের জন্যে? শাড়ি-গয়নার জন্য বউয়ের ঘ্যানঘ্যানানি; ছেলের দুধ, চাল-ডাল-তেল-নুন-লাকড়ি কেনাকাটার ঝামেলা; সংসারের অভাব, টানা-পোড়েন, ঝড়-ঝাপটা কিছুই গায়ে লাগেনি হাসানের। গায়ে লাগতে দেয়নি কুন্তী। মাস্টারি করে, টিউশনি করে একা সামলেছে সংসার। সংগীতশিল্পী হাসানকে থাকতে দিয়েছে গান নিয়ে তার আপন-ভূবনে। বিনিময়ে কুন্তী শুধু চেয়েছে, পথের ডাকে হাসান যেনো আবার বেরিয়ে না পড়ে।
অথচ কি হলো? পথের টান আবার ঠিকই ঘর ছাড়া করলো হাসানকে। পথ চলতে চলতে আনমনেই হয়তো বাঁধা পড়ে যাবে নতুন কোনো বাঁধনে। নিজেকেই বারবার প্রশ্ন করে কুন্তী- এতোই কি ঢিলেঢালা ছিলো ওর ভালোবাসার বাঁধন? জবাব মেলে না।
মৌ, আদরের সাথে কথা বলতে বলতে কখন যে আনমনা হয়ে গেছে কুন্তী খেয়ালই করেনি। আর বোন, দুলাভাই, মৌ কেউ ওকে বিরক্তও করেনি। হয়তো মৌ’ই সামলেছে ওর বাবা-মাকে। মৌ‘টাই কুন্তীর মনটা সবচে’ ভালো পড়তে পারে। বাইরের সবাই জানে মৌ কুন্তীরই মেয়ে। কুন্তী জানে, ওরা সবাই এমনকি অল্পদিনের চেনা রাজুও বোঝে ওর দুঃখ। কিন্তু দুঃখ মোছার উপায় নেই ওদের কারো হাতেই। ওরা খুব বেশি হলে বিষন্ন হয়ে বসে থাকতে পারে ওর চারপাশে। কেউ কেউ হয়তো লুকিয়ে কাঁদেও ওর দুঃখে। কুন্তীর নিজেরও মাঝে মাঝে ভারি কান্না পায়।
অতি বাস্তববাদী কেউ কেউ ওর সমস্যার সরল সমাধান দিয়েছে অনেকবার। বলেছে, ওসব বস্তাপচা সেন্টিমেন্টের দিন শেষ হয়ে গেছে। তুমি বললে আমরা নতুন কাউকে……। ওদের কথায় রাগে-ক্ষোভে, দুঃখে-অপমানে স্তব্ধ হয়েছে কুন্তী, কিন্তু মুখ ফুটে কোনো প্রতিবাদ করতে পারেনি। জীবন থেকে ভালোবাসা হারিয়ে গেলে আর কী থাকে, যা নিয়ে খুব আনন্দে বেঁচে থাকা যায়?!
আদর ঘুমিয়ে পড়েছে ওর কোলের মধ্যে। কুন্তী মৌকে বললো- তোরা যা, আমি ঘুমোবো।
-খাবে না?
-নারে, খেতে ইচ্ছে করছে না।
অনেকদিন হলো গভীরভাবে ঘুমোতেও পারেনা কুন্তী। যতোক্ষণ জেগে থাকে ততোক্ষণ হাসান প্রবলভাবে দখল করে রাখে ওর চৈতন্য। তবুওতো আদর আছে! আদরকে বুকে চেপে ধরে সামান্য হলেও কমে ওর কষ্ট। আদর যে ওর চৈতন্যে হাসানের স্মৃতিকে জাগিয়ে রাখে সারাক্ষণ।
অন্ধকারে তন্দ্রাচ্ছন্ন কুন্তী আদরকে বুকের আরো ভেতরে টেনে নেয়। আদরের ঘুমের তাতে একটুও ব্যঘাত হয়না। সে বেঘোরে ঘুমায়। বুকের এতো কাছাকাছি থেকেও আদর জানেনা সারাক্ষণ কি ঝড় বয় মা’র বুকের মধ্যে।
বাইরে থেকে মোটেও বিধ্বস্ত মনে হয়না কুন্তীকে। সারাক্ষণ হাসছে, কথা বলছে। মনে হয় এই খানিকক্ষণ আগেই বুঝি মজার কিছু ঘটে গেছে ওর জীবনে। ভিতরে ভিতরে ক্ষয়ে যেতে থাকা কুন্তীর সব দুঃখের পেছন থেকে উঁকি মারে আশা। ওর কেনো যেনো প্রায় সারাক্ষণই মনে হয়- হাসান আবার ফিরে আসবেই। এতো জোর ভালোবাসা কি ব্যর্থ হয় কখনো?!

লেখক-

এডভোকেট, জজকোর্ট ফরিদপুর।

উপদেষ্টা সম্পাদক, সাপ্তাহিক আগামীর প্রত্যাশা ও www.agameerprotyasha.com

সম্পাদক, www.mukti24.com

মোবাইল-০১৭১৮ ২৭২৭৮৩

Print Friendly, PDF & Email


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ