শুক্রবার, ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:১২ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম :
E-Paper-12.10.2021 E-Paper-15.08.2021 নড়াইলে কঠোর লকডাউন চলছে, আক্রান্তের হারও হু হু করে বাড়ছে থেমে নেই মৃত্যু কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টারে গুলি: ‘জাকারবার্গ’কে খুঁজে দিতে পুরস্কার ঘোষণা! মাগুরার মহম্মদপুরে যুবকের বস্তাবন্ধি লাশ উদ্ধার। ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশু কন্যার জীবন বাঁচাতে সাহায্য কামনা অনুষ্ঠিত হলো তথ্য কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল কর্মশালাঃ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মীদেরকে সরকার ও জনগণের মধ্যে “সেতুবন্ধ” বললেন সচিব নগরকান্দায় বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ আহত -১৫ কুষ্টিয়ায় আলোচিত ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা আটক আলফাডাঙ্গায় আ’লীগ নেতার বাড়িতে হামলা গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ

এক মুঠো বকুল

-সিরাজুল ইসলাম মিয়াঃ
রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে কাজের মেয়ে জরিনা বলে, আম্মা বড় ভাইজান কবে আসবেন ? জরিনার কথার কোন উত্তর দেয় না মা। সারা জীবন বিরাট একটা সত্যকে বুকের মাঝে পাথর চাপা দিয়ে সংসার করে যাচ্ছে দিপ্তী। বড় ছেলে ইমরান জাপান থাকে। বাড়ি আসার কথা ছিল, কিন্তু আসে নাই। ছোট ছেলে কামরানকে নিয়ে বরিশাল থাকে। স্বামী অনেক আগেই মারা গেছে। কামরান পড়াশুনা করে। পড়াশুনার প্রতি তেমন নজর নেই। সারা দিন রাজনীতির ডাকমাডোলে মেতে থাকে। মা জোর দিয়ে কিছু বলে না। মাঝে মাঝে বুঝাতে চেষ্টা করে, রাজনীতির অঙ্গনে জীবনকে একেবারে ডুবিয়ে দিলে সকলের জন্য সুফল বয়ে নাও আনতে পারে। কারণ এদেশের রাজনীতি বড় উগ্র।

ছেলের দিকে তাকিয়ে মনে পরে কলেজ জীবনের কথা। সেই গণআন্দোলন হৈ-হুল্লোর মাঝ দিয়ে কেমন করে পরিচয় হয়ে ছিলো শফিকের সাথে। তারপর ভালোবাসা, কলেজ ক্যাম্পাসে পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল মাসুমার পাশে। কোথা হতে হন্ত দন্ত হয়ে ছুটে এসে মাসুমাকে লক্ষ্য করে বলে শফিক- এই যে মাসুমা, তুমি এখানে আর আমি তোমাকে সারা কলেজ চত্বরে খুঁজে খুঁজে হয়রান। মাসুমা হেসে বলে আমিও আপনাকে খুঁজছি। তা বেশতো বলুননা কি করতে হবে ? শফিক দিপ্তীকে দেখে কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে গেল। শেষে খানিক ঢোক চিপে বলে- মাসে অন্য কোন কর্মসূচী পেয়েছ। মাসুমা আগ্রহ নিয়ে বলে, সে সবতো আপনি জানাবেন। তারপর ……. মিটিং। মিটিং এ পরবর্তী কর্মসূচী জানিয়ে দেওয়া হবে।

শেষে অনেকক্ষণ নীরব থেকে শফিক বলল, তোমার সাথে ও কে? মাসুমা বেশ জোরে হেসে দিয়ে বলে, ও আপনি চেনেন না ! ও আমাদের পাশের বাসার খালিদ চাচার মেয়ে দিপ্তী। শফিক মৃদু হেসে বলে, এবার ভাবুন ও আপনার কর্মব্যস্ত জীবনে কতটুকু তৃপ্তি দিতে পারবে। সব চাইতে একটা আনন্দের কথা শফিক ভাই, আপনার কর্মীদের মধ্যে যে কয়জন হিতৈষী আছে তাদের মধ্যে ওকে প্রথম শ্রেণীর প্রথম মানুষটি বলে জেনে নিতে পারেন। দিপ্তী মাসুমাকে একটা ধাক্কা দিয়ে বলে- তুই একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছিস মাসুমা। শফিক অনেক্ষণ চেয়ে থাকে দিপ্তীর মুখের দিকে কি যেন স্বপ্ন খুঁজছে শফিক ওর মাঝে। মনে হয় কত কালের আপনজন ও।

এ কয়দিন রোজই প্রায় শফিক দিপ্তীর সাথে কথা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু সময় পেলেও সুযোগের অভাবে পারে নাই। আগামী কালই মিছিলের মিছিলের দিন। কলেজে একটা জোর প্রস্তুতি চলছে। শুধু কলেজই নয়, দেশের সমগ্র শহরগুলোতে প্রচন্ড উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি গ্রামের মানুষের মধ্যেও চরম প্রক্রিয়া দেখা দিয়েছে। দিপ্তী কলেজ বিল্ডিংয়ের উত্তর কোণে একা একা দাঁড়িয়ে আছে। শফিক খুব ব্যস্ততা নিয়ে মোড় কাটিয়ে সামনে এহুতেই দিপ্তী ডাক দেয় শুনুন। শফিক পিছন ফিরে চেয়ে দেখে দিপ্তী।

শফিক হেসে বলে, দেখছি আমার কথা মনে রাখছেন। দিপ্তী উত্তর দেয় মনে যদি না রাখতাম, তবে কি খুশি হতে পারতেন? শফিক একটু অন্য কায়দায় বলে, কি জানি মেয়েদের মন ষোল আনা বুঝে উঠতে পারিনে। দিপ্তী একটু ভ্রুকুটি করে বলে- এ পর্যন্ত কয়জনের মনকে বুঝতে চেষ্টা করেছেন। শফিক একরকম অপ্রস্তুত হয়েই বলে, না-মানে এই কেবল একজনকেই বুঝতে চেষ্টা করছি।

দিপ্তী চাপা গলায় বলে, থাক এত বুঝে কাজ নেই। একটু নীরব থেকে দিপ্তী আবার বলে, শফিক ভাই কালকে মিছিলে আমি তোমার না মানে আপনার পাশে থাকবো। শফিক হেসে দিয়ে বলে আর আপনি বলতে হবে না। তারপর বেশ কিছু সময় নিরব থেকে শফিক বলে, দিপ্তী; যেখানে হৃদয়ের চাওয়া পাওয়ার ইচ্ছা প্রবল সেখানে শতচেষ্টা করেও সেই আসল সত্যটাকে চেপে রাখা যায় না। শুধু এইটুকুই আজ বলে গেলাম আমার মনের মনিকোঠায় দিপ্তী আর দ্বীপ জ্বেলে দিয়ে গেল।

বিশাল জনাতার ঢল নেমেছে ঢাকার রাজ পথে। মিছিলের সামনে সফিক, পাশে দিপ্তী। মেডিকেল হাসপাতালের সামনে আসতেই পুলিশের ব্যারিকেট। শুরু হলো সংঘর্ষ। লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, সর্বশেষ আক্রমন গুলি। হঠাৎ একটি গুলি এসে শফিকের বাম হাতটি উড়িয়ে নিয়ে গেল। আর একটা গুলি এসে লাগল পায়ে। গভীর আর্তচিৎকারে শফিক ঢলে পড়লো দিপ্তীর কাধের উপর। রঞ্জিত হলো পিচঢালা রাজপথ। বাংলার দামাল ছেলেরা জাতির ভাগ্যকাশে এনে দিলো স্বাধীনতার প্রথম সোপান।
রাত অনেক। হাসপাতালে শফিকের পাশে অশ্র“সিক্ত নয়নে বসে আসে দিপ্তী।

মনে ওর হাজারো প্রশ্নের ভীড়। অজানা আশংকায় বার বার হৃদয়টা দুরুদুরু কাঁপছে। ডাক্তার শুধু দিপ্তীকে বলেছে- রোগীর জ্ঞান ফিরতে অনেক দেরী হবে। শেষ রাতের দিকে শফিকের জ্ঞান ফিরে আসে। চোখ তুলে চাইতেই দিপ্তীর চোখে চোখ পড়ে যায় শফিকের। অনেক কষ্টে ডান হাত দিয়ে দিপ্তীর একটা হাত বুকে চেপে ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে শফিক। তারপর বলে, দিপ্তী আমার বাম পাশ কেন শুন্য বোধ হচ্ছে বলতে পার। দিপ্তীর চোখে তখন অশ্র“। আর একটি হাত তখন শফিকের কপালে রেখে বলে, তুমি শান্ত হও শফিক ভাই পৃথিবীর কোন শক্তিই আমাকে তোমার কাছ তেকে সরিয়ে নিতে পারেবে না।

তারপর উনসত্তর গেল, সত্তর গেল, এলো একাত্তুর। সশ্বস্ত্র সংগ্রামের মাঝে দেশ স্বাধীন হলো। দিপ্তী ভালোবাসে শফিককে। দিপ্তীর হৃদয়টা গর্ব আর গৌরবে কানায় কানায় ভরে ওঠে। আর শফিক স্বাধীনতা সূর্যের আর এত জলন্ত প্রতীক। শফিক চাকুরী করে। দিপ্তী বি.এ পাস করে বসে আছে। স্বাধীনতা উত্তর কালে কত আশা, কত স্বপ্ন ছিল ওর মনে। দিপ্তীর বাবা চাকুরী থেকে অবসরপ্রাপ্ত। বড় ভাই সন্ত্রাসী কার্যকলাপে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। পেনশনের সামান্য টাকায় সংসারে হাল সামলাতে হিমশিম খেয়ে ওঠেন দিপ্তীর মা। তারপর দিপ্তীর জন্য ভাবনা।

একদিন মা দিপ্তীকে ডেকে জিজ্ঞেস করে, শফিক কি তোকে কিছু বলেছে ? দিপ্তী সহজ ভাবে উত্তর দেয়- না মা কদিন যাবৎ ওর সাথে দেখা হয় না। কোম্পানীর স্বার্থে জরুরী অবস্থায় মালিক শফিককে ট্রেনিং এ কানাডায় পাঠানোর জন্য সাবস্ত করলো। সময় এতই সংকীর্ণ যে দিপ্তীকে বলে যাবার মত সময় শফিকের রইলো না। প্লেনে ওঠার আগে ছোট্র একটি কাগজ রেখে গেছে। তাতে লেখা, দিপ্তী লক্ষীটি মাত্র একটি বছর অপেক্ষা কর, আমি ফিরে এসে তোমাকে নিয়ে যাবো।

দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনি করে দুটি বছর কেটে গেল। শফিক ফিরো এলো না। দীর্ঘ তিন বছর পর শফিক ফিরে এলে, যখন জানলো ওর বিয়ে হয়ে গেছে তখন ওর মনে হতে লাগল, এ পৃথিবীর সমস্ত প্রয়োজন ওর শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু ওর বিদায়ের পালা। অনেক দিন মন প্রান দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করলো কোম্পানীর। কিন্তু মন তো আর বিলাস ভূষণ নয় যে, ইচ্ছা মত ব্যবহার করা যাবে। কিছুতেই নিজেকে ডুবাতে পারলো না কাজের মাঝে। হৃদয়ের অসংখ্য যন্ত্রনার বোঝা নিয়ে একদিন চাকুরী ছেড়ে দিয়ে চলে এলো বরিশাল। জীবনের শেষ চাওয়া পাওয়া শুধুমাত্র একবার দেখবে দিপ্তীকে। তারপর সবার অলক্ষ্যে চলে যাবে পৃথিবীর অন্তরালে।

যা সুন্দর তা চিরদিনই সুন্দর। তা যত কুৎসিত কদাকারের মধ্যেই থাকুক না কেন তার মূল্য সর্বত্র একই। এখানে এসেও সে জড়িয়ে পড়েছে একটি জনকল্যাণ প্রতিষ্ঠানের সাথে। সকলের মনের কাছে সে মহৎ শ্রদ্ধা ভাজন আর মাথার মনি।
ছেলে বৌ নিয়ে সুখের সংসার দিপ্তীর। বড় ছেলে ইমরান জাপান থেকে ফিরে এসে বিরাট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক। কিন্তু কিসের অভাব যেন দিপ্তীর হৃদয়ে। কাউকে বুঝতে পারে না, বলতেও পারে না। এক প্রচন্ড ব্যাথার পিরামিড নিয়ে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে দিপ্তী। মায়ের এ অবস্থা জ্ঞান হবার পর থেকেই উপলব্ধি করে আসছে ইমরান। তখন ও মনে করেছিল হয়ত অভাব অনটনের কারণেই মায়ের মনের অবস্থা এমন।

নিজের ঘরে বসে অতীতের স্মৃতি মন্থন করছে দিপ্তী। মনের কোণে ভেসে আসে শফিকের গুলি খাওয়া, ঢলে পড়ার করুণ ছবি। আত্মচিৎকার করে বলের্ছিলো দিপ্তী আমায় ফেলে চলে যেও না। সবই আজ অস্পষ্ট কালো মেঘে ঢাকা। ইমরান যে কখন রুমের মধ্যে প্রবেশ করেছে দিপ্তী তা টেরই পায় নি। কি চাও তুমি? মা কেমন যেন অপ্রস্তুত হয়ে যায়। কোন মত নিজেকে সামলে নিয়ে বলে- আমার তো কিছুই হয়নি বাবা। আমি তো ভালোই আছি। ইমরান সহজে মেনে নিতে পারে না মায়ের এই উত্তর। মায়ের কাছে বেশী কিছু জানতে চাওয়া ঠিক হবে না। তবুও আর একবার জিজ্ঞাস করে মা সারা জীবন তুমি আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করেছ। আমার জীবনের বিনিময়েও আমি তোমার মুখে হাসি দেখতে চাই। বল মা আমি কি করলে তুমি শান্তি পাবে।

মা অনেকক্ষণ নীরব থেকে উঠে দাঁড়িয়ে ইমরানকে জড়িয়ে ধরে বলে আমার পাগল ছেলে। আমি জানি তুই আমার জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে পারিস । হ্যাঁ বাবা তোর কাছে আমার একটা জিনিস চাইবার আছে। সময় এলে আমি তোর কাছ থেকে চেয়ে নেব।
পড়ন্ত বেলা। মনটা বড় ভারী হয়ে উঠেছে দিপ্তীর। অনেক দিন বাইরে যায় না। ভাবল আজ একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসবে। বড় বউ নাস্তা নিয়ে ঘরে ঢুকে বলে, মা আপনার নাস্তা এসেছি।

দিপ্তী ফিরে চেয়ে বলে, দেখত পাগলী মেয়ের কান্ড। তুমি আবার এখন এত কষ্ট করতে গেলে কেন ? বড় বউ দুঃখ করে বলে দুপুরে তেমন কিছু খেলেন না। আচ্ছা মা আপনি কি আমাদের কাজ কর্মে কষ্ট পান। দিপ্তী হেসে দিয়ে বলে, ছিঃ মা কষ্ট পাব কেন। তোমরা তো আমাকে অনেক সুখে রেখেছ। সত্যি কথা বলতে মা আজ কাল প্রায়ই শরীরটা ভালো থাকে না। বয়স যে অনেক হয়ে এলো মা। বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ইমরান বলে বাইরে যাবে মা? তা গাড়ীতে যাও আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি। এই দেখ ছেলের কথা। আমি গাড়ীতে উঠি নাকি।

তোর বাবা থাকতে হেটে চলা ফেরা করেছি। এখন তো আর হাটতে পারি না। তা একটা রিকসা হলেই চলবে বাবা। কথাটি বলেই দিপ্তী ঘরের বাইরে এসে দাঁড়ালো। ইমরান একটা রিকসা ডেকে দিয়ে বলে, সকাল সকাল ফিরে এসো মা। তোমার তো আবার শরীর ভালো না।

অনেক দূর চলে আসে দিপ্তী। প্রায় শহরের উপকন্ঠে। হঠাৎ সামনে চাইতেই দেখে বেশ খানিক দুরে একটা লোক রাস্তার পাশ দিয়ে একমনে হেটে যাচ্ছে। মনে হয় বড় ক্লান্ত। ভাবালুতার অতল গভীরে এ মানুষটি। বিষ্মিত হয়ে যায় দিপ্তী। যেন চিরচেনা এই মানুষটি শফিক ভাই নয়ত? সেই বা এখানে কি করে আসবে। হ্যাঁ সেইতো। ওই যে বাম হাতটা নেই। পুলিশের লাঠির আঘাতে বাম পা টা টেনে টেনে হাটে। দিপ্তী আর এগুতেই পারে না। সারা দেহে নেমে আসে ক্লান্তির অবসাদ। আপন মনে বলে ওঠে শফিক ভাই- তুমি আজ এখানে আমার কত কাছে। অথচ আমি তোমাকে দেখতে পাই নে। এরপর ছোট একটা গলির ভিতরে এগিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে শফিক।

পরের দিন দিপ্তী এসে শফিকের ঘরে ঢুকে পড়ে। দেখে একজন পৌঢ় গোছের লোক বিছানাপত্র ঝাড় দিচ্ছে। দিপ্তী লোকটির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাস করে- এখানে শফিক ভাই থাকেন ? লোকটি অতি সহজ এবং স্বাভাবিক কোন প্যাচ গোছ না করে উত্তর দেয় জি আপনি কই থনে আইলেন ? দিপ্তীর বুকটা কাঁপছে। হয়ত এত কাছে পেয়েও তার দেখা পাবো না। ব্যস্ত হয়ে দিপ্তী বলে সে কথা পরে হবে। আপনি বলেন, তিনি এখন কোথায় ?

লোকটা গভীর বেদনার সুরে বলে- হেই বখা আর হুইনেন না আপা। সারা জীবন পরের জন্য ছুডাছুডি কইরা জীবনডারে খোয়াইয়া দিছে। সহজ সরল এই মানুষটির কথা দিপ্তীর হৃদয় ভেঙ্গে চুরে খান খান করে যেতে চাই। ধৈয্যের বাঁধ আর রাখতে পারে না ও। তীর বেধা আহত পাখির মত। ভাঙ্গা কন্ঠে দিপ্তী আবার বলে আপনি দয়া করে বলুন তিনি এখন কোথায়। একটু ঢোক চেপে বলে লালু কোথায় যে গেছে তা কইবার পানিনে। হেই বিয়ানবেলা না খাইয়া বাহির হইয়া গেছে, অহন তামাত বাসায় ফিরা আইল না। শরীরটা ভালো না কি যেন অসুখ আইছে।

দিপ্তীর বুকের মাঝে অজানা আশংকায় আর একবার বেদনার বোঝা নড়ে ওঠে। চাপা গলায় বলে তার স্ত্রী এখানে নেই ? লালু মাথা নেড়ে বলে কি যে বলেন আপা ওই কথা কইলে তিনি কেমন যেন হয়ে যাস। এক দিন কথায় কথায় তিনি আমাকে কইলো লালুরে তোর ভাবি যে আর কোনদিন আমার কাছে আসবে না। সে যে অনেক সুখে আছে। রোজ বিয়ান বেলাই এই ছবিটারে মুছেন আর লুকায় লুকায় চোখের জল ফেলেন। ছবিডারে প্রায় আপনার নাহাল দেহা যায়। দেয়ালের দিকে চোখ ফিরাতেই দেখে দিপ্তী সেই কলেজ জীবনের নবীন বরণ অনুষ্ঠানে রাঙা চেলী দেওয়া যে কাপড় খানা পড়ে গান গেয়েছিলো সেই ছবি খানি। লালু বলে, আপা আপনি বসে আমি চা নিয়ে আসি।

দিপ্তী ছবি খানি নামিয়ে হাতের উপর তুলে ধরে এক দৃষ্টিতে নীরব নিথরে চেয়ে থাকে অনেকক্ষণ। তারপর আপন মনে অশ্র“ভেজা কান্না বিজড়িত কন্ঠে বলে উঠে ওগো শফিক ভাই এত বড় প্রতিশোধ তুমি নিলে আজও তুমি আমার স্মৃতি বুকে ধরে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছ। অথচ আমাকে একটুও তা বুঝতে দিলে না। আর একটি বারও আমাকে বুঝতে চেষ্টা করলে না। আমি কোথায় আছি, কেমন আছি।

দু’দিন পরের কথা। দিপ্তী শফিক ভাই এর সাথে দেখা করতে এসেছিল। হঠাৎ সামনে লালুর সাথে দেখা দিপ্তী জিজ্ঞাসা করে, লালু ভাই শফিক ভাই কি এসেছেন। লালু একটু এগিয়ে এসে জবাব দেয়, হ আপা আইছিলো অহন আবার বরিশালের ভোলার দিকে রওনা হইয়া গেছে। হেইখানে নাকি বড় তুফান অইছে। অগোর লাইগা কাপড়, খাবার, ওষুধ লইয়া চইলা গেছে। দিপ্তী নিরব আর পাথরের মত নিশ্চল হইয়া যায়। হৃদয়ের জমাট বাধা অসংখ্য কথার মালা সে হারিয়ে ফেলে। সবকিছু হৃদয়ের অন্তরালে চাপা পড়ে।

শুধু একটি কথাই দীর্ঘশ্বসে বেরিয়ে আসে- শফিক হয়তো তোমার সাথে আমার আর কোন দিন দেখা হবে না। লালু আর নিজেকে বুঝাতে পারে না আবেগপ্লুত কন্ঠে আবার বলে, শফিক ভায়ের কি যে অসুখ। হেইদিন ডাক্তার আমারে ডাক দিয়া কয়- লালু মিয়া, শফিক সাহেবের দিক লক্ষ্য রেখ। সব সময়ে বিশ্রামে থাকতে বলছে। গভীর মিনতির সুরে লালু বলতে থাকে, আপা শফিক ভাই আমার কথা শুনে না। আপনি একটু মানা কইরা দিয়েন। আমি বুঝতে পারছি আপনার কথা সে না শুইনা পারবো না। সে আইলে আমি আপনারে খবর দিমু। এমন মানুষ আর হবি নে। আকাশের নাগাল বিশাল আর সাগরের নাগাল বুক ভরা ভালোবাসা। দিপ্তীর প্রান খুলে কাঁদতে ইচ্ছা করে। কিন্তু পারে না। কোথায় যেন বাঁধা। চোখের চলে শুধু বলে লালু ভাই এমন মানুষটি শুধু আমি চিনে নিতে পারলাম না।

বেশ কয়েকদিন পরের কথা। দিপ্তী বাসা থেকে বের হবার চেষ্টা করছে। কিন্তু পারে নাই। আজ সে জীবনপণ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। ছেলে, বউ, সমাজ সংসার কোন কিছুতেই আজ তাকে আটকিয়ে রাখতে পারবে না। সে আজ পঁচিশ বছর আগের দিপ্তী। সে গৃহিনী নয়, মাতা নয়। সে একজন প্রনয়িনী। শুধুমাত্র একজনের প্রেমিকা। আজ যাবে সে তার প্রেমিকের কাছে। ঘর থেকে ঝড়ের বেগে বেড়িয়ে সোজা চলে এলো শফিকের বাসার সামনে। তখন লালু ঘর থেকে বেরুবার চেষ্টা করছে। দিপ্তীকে দেখা মাত্র লালু কেঁদে দিয়ে বলে, আপা সব বুষি শ্যাষ অইয়া গেছে। আমার শফিক ভাই বুঝি আজ আর বাইচ্যা নাই। এহন মেডিক্যাল হাসপাতালে আছে।

আমি খবর পাইয়া দুইটায় তার কাছে গিয়েছিলাম। আমারে দেইখ্যা কয়- লালু তুই কি আমার দিপ্তীকে চিনিস। আপা ক্যান আপনি আগে আইলেন না। এমন ফেরেশতার নাগাল মানুষটারে ……….। আর বলতে পারে না লালু। একে বারে শিশুর মত র্কেঁদে ফেলে- দিপ্তীর আজ আর কিছুই বুঝতে বাকী থাকে না। চলার শেষ। জীবনের শেষ। নাটকের শেষ। দিপ্তী চলে আসে হাসপাতালের সামনে। জনাকীর্ণ হাসপাতাল। ভীড় ঠেলে এগিয়ে আসে দিপ্তী সিড়ির কাছে দেখে সিড়ি দিয়ে স্ট্রেচে করে সিঁড়ি বেয়ে চাদর দিয়ে ঢাকা একটি মানুষকে সবাই ধরাধরি করে নামিয়ে নিয়ে আসছে।

সমবায় সমিতির সামনে নেমেছে জনতার ঢল। পেয়ে হারানোর ব্যাথায সকলের চোখেরই অশ্র“। বেদনার দীর্ঘশ্বাসে সারা আকাশটায় বিষাদের ছায়া। ভাষা নেই। কথা নেই। শুধু ফুলে ফুলে ভরে গেল সমাধির সমস্ত আঙ্গিনা।
সবাই শিথিল পায়ে নিঃক্রান্ত হলো সেই মহান মানবের সমাধির পাশ থেকে। তখন ক্লান্ত সূর্যটাা পশ্চিম দিগন্তে হারিয়ে যাবার গ্রহন গুনছে। একটু দুরে বকুলের তলে দাড়িয়ে আছে একটি প্রানী। নীরব নিথর দুটি ভেজা চোখ ওর। হাতে একমুঠো বকুল। শান্ত ধীর পায়ে এগিয়ে আসে সমাধির পাশে। অনেকক্ষণ একদৃর্ষ্টিতে চেয়ে থাকে সমাধির পানে। তারপর অস্ফুট স্বরে বলে, শফিক তুমি বড় ভালোবাসতে এই বকুল ……………………..।

Print Friendly, PDF & Email


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ