সোমবার, ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১১:৩৫ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
E-Paper-12.10.2021 E-Paper-15.08.2021 নড়াইলে কঠোর লকডাউন চলছে, আক্রান্তের হারও হু হু করে বাড়ছে থেমে নেই মৃত্যু কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টারে গুলি: ‘জাকারবার্গ’কে খুঁজে দিতে পুরস্কার ঘোষণা! মাগুরার মহম্মদপুরে যুবকের বস্তাবন্ধি লাশ উদ্ধার। ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশু কন্যার জীবন বাঁচাতে সাহায্য কামনা অনুষ্ঠিত হলো তথ্য কর্মকর্তাদের ভার্চুয়াল কর্মশালাঃ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কর্মীদেরকে সরকার ও জনগণের মধ্যে “সেতুবন্ধ” বললেন সচিব নগরকান্দায় বাস-ট্রাক মুখোমুখি সংঘর্ষ আহত -১৫ কুষ্টিয়ায় আলোচিত ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা আটক আলফাডাঙ্গায় আ’লীগ নেতার বাড়িতে হামলা গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগ

ইতিহাসের সাক্ষী সাতৈর শাহী মসজিদ

-এড. গাজী শাহিদুজ্জামান লিটনঃ
দিল­ীর সালতানাতের যখন পতনের যুগ বাংলায় তখন স্বাধীন সুলতানরা প্রবল পরাক্রমে রাজত্ব করছিলেন। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের মধ্যে আলাউদ্দিন হোসেন শাহকে অভিহিত করা হয় ‘মধ্যযুগে বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ নরপতি’ হিসেবে। তাঁর শাসনামলকে বলা হয় ‘স্বর্ণযুগ’। অত্যন্ত উদার শাসক ছিলেন তিনি। তাঁর উদারতার কারণে তিনি পেয়েছিলেন প্রজাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। তাঁর আমলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রভূত উন্নতি হয়। মালাধর বসু, ‘মনসামঙ্গল’ রচয়িতা বিজয়গুপ্ত, ‘মনসা বিজয়’ রচয়িতা বিপ্রদাস, বিদ্যাপতি, যশোরাজ খাঁ প্রমুখ কবি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। সাম্প্রদায়িক স¤প্রীতি স্থাপনে তিনি অনন্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর উদারতায় মুগ্ধ হয়ে হিন্দু প্রজারা তাঁকে ‘নৃপতি তিলক’ ‘জগৎ ভূষন’ এসব উপাধি দিয়েছিলেন। তাঁর শাসনামলেই শ্রী চৈতন্য বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন। যে ধর্মে বর্ণ বা জাতিভেদের কোনো বালাই নেই। তাঁর নির্মিত অনেক স্থাপত্য আজও টিকে আছে-স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে এই অমর সুলতানের গৌরব-গাঁথা। তাঁর স্থাপত্য কীর্তির মধ্যে গৌড়ের ছোট সোনা মসজিদ এবং বর্তমান
মানিকগঞ্জ জেলা শহরের ১৫ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত মাচাইন মসজিদের নাম উলে­খযোগ্য।

এই অমর সুলতান মুরীদ হয়েছিলেন বর্তমান ফরিদপুর জেলার বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর গ্রামের এক পীরের কাছে। তৎকালীন সময়ে সাতৈরে অনেক অলি আউলিয়া দরবেশের বসবাস ছিল। তাই এ গ্রামের নাম হয়ে গিয়েছিল ‘শাহ-হে-তুর’। ফার্সি এই শব্দটির অর্থ ‘অলির পাহাড়’। ‘শাহ-হে-তুর’ শব্দটিই ধীরে ধীরে সাতৈরে পরিণত হয়। আলাউদ্দীন হোসেন শাহ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন ১৪৯৩ খ্রিষ্টাব্দে। ১৫১৯ সালে তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে শেষ হয় তার গৌরবময় শাসনামলের। বাংলার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন তারই সুযোগ্য পুত্র নসরত শাহ। যাঁর রাজত্বকাল ছিল ১৫১৯ থেকে ১৫৩২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত। তিনিও পিতার মত সদাশয় ও উদার শাসক ছিলেন। শিল্প ও সাহিত্যেরও তিনি বিশেষ অনুরাগী ছিলেন। তিনি গৌড়ে বড় সোনা মসজিদ ও কদম রসুলের দরগাহ নির্মাণ করেন। তার পিতার পীরের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে তিনি সাতৈরেও একটি মসজিদ নির্মাণ করেন, যা আজ সাতৈর শাহী মসজিদ নামে পরিচিত।

অনেকে অবশ্য এই মসজিদের নির্মাতা হিসাবে ইলিয়াস শাহী বংশের আর এক সুলতান নাসিরুদ্দীন মাহমুদ শাহের (রাজত্বকাল ১৪৪২ থেকে ১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) নাম উলে­খ করেন। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক এটাকে নসরত শাহের কীর্তি বলে মনে করেন। এছাড়া অনেক ঐতিহাসিক শেরশাহ (জীবনকাল ১৪৭২ থেকে ১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত) মসজিদটি নির্মাণ করেছেন বলে মনে করেন। তাদের মতে, ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে শেরশাহ বাংলার রাজধানী গৌড় দখল করেন এবং তাঁর আমলে কালক্রমে বঙ্গদেশ দিল­ীর প্রত্যক্ষ শাসনে চলে আসে। তিনি সোনারগাঁও থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত বি¯তৃত একটি সুন্দর, প্রশস্ত ও দীর্ঘ রাস্তা নির্মাণ করেন। সেটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোড’। রাস্তাটি চলে গেছে সাতৈরের বুক চিরে। এই পথ দিয়ে চলাচলের সময় শেরশাহ এখানে একটি সরাইখানা/বিশ্রামাগার তৈরী করেন।
নামাজের ওয়াক্ত হলে সেখানে তাঁরা নামাজও পড়তেন।

এই বিশ্রামাগারটিকেই পরবর্তীতে তিনি মসজিদে রূপান্তরিত করেন। ঐতিহাসিক এই মসজিদটি দৈর্ঘ্যে প্রস্থে সমান (৬২ ফুট ৬২ ফুট)। ভূমি সমতল থেকে এর বর্তমান উচ্চতা ৩০ ফুট। মাটির নিচে ভিত্তি (ফাউন্ডেশন) হিসাবে আছে আরো দশ ফুট। এর দেয়ালের গাঁথুনি সাড়ে পাঁচ ফুট। এই স্থাপনাটিতে কোন লোহা বা কাঠের বর্গা/বীম নেই। মসজিদটির গম্বুজের সংখ্যা ৯টি। সম্পূর্ণ শূন্যের উপর ছাদ বা গম্বুজ কয়টি আরও অক্ষত অবস্থায় আছে যা প্রতিটি দর্শনার্থীকে অবাক করে।
মসজিদটিকে ঘিরে অনেক কিংবদন্তী প্রচলিত আছে মানুষের মুখে মুখে। এর নির্মাণ নিয়ে প্রচলিত কিংবদন্তীটি হচ্ছে-কোন এক পূন্য রাতে ফেরেশতাদের দ্বারা নির্মিত হয়েছিল মসজিদটি। এরপর ধীরে ধীরে সেটি মাটির নিচে ডেবে যাচ্ছে। যে দিন মাটির নীচে সম্পূর্ন অদৃশ্য হয়ে যাবে মসজিদটি, সেদিন কিয়ামত হবে। সন্ধ্যায় কেউ ঢেঁকিতে পার দিলে মসজিদটি গায়েব হয়ে যাবে।

মসজিদটির প্রতি এলাকার অধিকাংশ মানুষেরই রয়েছে অন্ধ আবেগ ও বিশ্বাস। তাদের অনেক ‘বিশ্বাস’ এর কয়েকটি হচ্ছে- মসজিদের ধুলাবালি গায়ে মাখলে কোন রোগ ব্যাধি হয় না। মসজিদের ইট বালি বাড়িতে রাখলে উঁই ধরে না, পরীক্ষার আগে কলমে মসজিদের ধুলা মেখে নিলে সাফল্য নিশ্চিত, মসজিদের চারটি পিলার থেকে বিভিন্ন ধরনের আওয়াজ বেরোয়, এসব পিলারের কাছে নিজ নিজ মনস্কামনা বললে তা পূরণ হয় ইত্যাদি।

এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা মসজিদে নিজ নিজ নিয়ন্ত্রন প্রতিষ্ঠা করতে সব সময়ই সক্রিয়। এ নিয়ে ইতোপূর্বে অনেক মামলা-মোকদ্দমা-সংঘর্ষও ঘটেছে।
এছাড়া মসজিদটি বিভিন্ন সময়ে অপরিকল্পিত ভাবে সংস্কার করায় এর মূল নির্মানশৈলী নষ্ট হচ্ছে। ঐতিহাসিক এই পুরাকীর্তিটি যথাযথ সংরক্ষণের জন্য প্রতœতাত্বিক বিভাগকে দায়িত্ব নিতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email


     এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ